
গাইবান্ধা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে কথিত ‘মল্লিক সিন্ডিকেট’-এর দাপট: অতিরিক্ত অর্থ আদায় থেকে রেকর্ড জালিয়াতির অভিযোগ
নিজস্ব প্রতিবেদক:
গাইবান্ধা জেলা সাব-রেজিস্ট্রি অফিসকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, সরকারি রেকর্ড বিকৃতি, বালাম বইয়ের পাতা গায়েব, জাল পে-অর্ডারের মাধ্যমে সরকারি রাজস্ব আত্মসাৎ, ভুয়া দলিল সম্পাদন এবং দালালচক্রের দৌরাত্ম্যের অভিযোগ বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় ও জাতীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। ভুক্তভোগী নাগরিক, দলিল লেখকদের একাংশ, বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের অভিযোগ—একটি প্রভাবশালী চক্র বছরের পর বছর ধরে ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাকে জিম্মি করে রেখেছে।
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদন, প্রকাশিত অভিযোগ ও ভুক্তভোগীদের বক্তব্যে দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মল্লিকের নামও উঠে এসেছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে দলিলপ্রতি ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের একটি প্রচলিত ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চালু রয়েছে। অর্থ প্রদান না করলে দলিল নিবন্ধনে বিলম্ব, অযৌক্তিক আপত্তি এবং নানা ধরনের হয়রানির শিকার হতে হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, মহাফেজখানায় সংরক্ষিত বালাম বই ও ভলিউম থেকে গুরুত্বপূর্ণ পৃষ্ঠা কেটে বা সরিয়ে ফেলা, মূল মালিকের নাম ঘষামাজা করে পরিবর্তন করা এবং পরবর্তীতে সেই রেকর্ড ব্যবহার করে জমির মালিকানা নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি করা হয়।
জালিয়াতির তথ্য গোপন রাখতে অনেক ক্ষেত্রে দলিলের জাবেদা নকল বা সার্টিফায়েড কপি পেতেও ভুক্তভোগীদের দীর্ঘদিন ঘুরতে হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
জাল পে-অর্ডার ও সরকারি রাজস্ব আত্মসাতের অভিযোগ;
বিভিন্ন অনুসন্ধানী প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, জমি নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত সরকারি পে-অর্ডার জাল করা কিংবা একই পে-অর্ডার একাধিক দলিলে ব্যবহার করার মাধ্যমে সরকারের কোটি কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, সরকারি কোষাগারে জমা হওয়ার কথা থাকলেও বিপুল অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের মাধ্যমে একটি সংঘবদ্ধ চক্র লাভবান হয়েছে।
অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের অভিযোগ;
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ, সরকারি নির্ধারিত ফির বাইরে দলিলপ্রতি ৬ হাজার থেকে ১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত অতিরিক্ত অর্থ না দিলে দলিল নিবন্ধন প্রক্রিয়া বিলম্বিত করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, প্রতিদিন অসংখ্য দলিল নিবন্ধন হওয়ায় এই অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের মাধ্যমে প্রতি মাসে বিপুল অঙ্কের অবৈধ লেনদেন সংঘটিত হয়।
ভুয়া দলিল ও রেকর্ড বিকৃতির অভিযোগ:
অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে জমির দাগ নম্বর পরিবর্তন, ভুয়া মালিক বা দাতা দেখিয়ে দলিল সম্পাদন, কৃষিজমির শ্রেণি পরিবর্তন এবং মূল রেকর্ড বিকৃতির মাধ্যমে অবৈধ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এসব অনিয়মের ফলে প্রকৃত জমির মালিকরা দীর্ঘ আইনি জটিলতায় পড়ছেন বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
দুদকের গণশুনানিতে ওঠে আসে একাধিক অভিযোগ
গাইবান্ধায় আয়োজিত দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) গণশুনানিতে সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের বিরুদ্ধে ওঠা একাধিক অভিযোগ আমলে নেওয়া হয়। অভিযোগগুলো অনুসন্ধানের জন্য কমিশনে পাঠানো হয় এবং সংশ্লিষ্ট দপ্তরকে তদন্ত করে প্রতিবেদন দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
গণশুনানিতে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দালালচক্রের প্রভাব, দলিল নিবন্ধনে হয়রানি এবং সরকারি রেকর্ডে অনিয়মের বিষয়গুলো ভুক্তভোগীরা তুলে ধরেন।
প্রতিবাদ, স্মারকলিপি ও প্রশাসনিক ব্যবস্থা:
এসব অভিযোগের প্রতিবাদে জেলার বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, নাগরিক সমাজ ও সামাজিক সংগঠন একাধিকবার মানববন্ধন, বিক্ষোভ এবং জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক উপদেষ্টার কাছে স্মারকলিপি প্রদান করেছে। তারা নিরপেক্ষ তদন্ত, দায়ীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা এবং ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন।
দীর্ঘ তদন্তের পর জেলা রেজিস্ট্রারের কার্যালয় থেকে অনিয়মের অভিযোগে কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারীর বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে অভিযোগকারীদের দাবি, নিম্নপর্যায়ের কিছু কর্মচারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলেও অভিযোগে উল্লিখিত প্রভাবশালী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের গতি এখনও সন্তোষজনক নয়।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির নাম নিয়ে অভিযোগ:
বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদন, ভুক্তভোগীদের অভিযোগ এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত কিছু বক্তব্যের সূত্র ধরে দলিল লেখক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মোস্তাফিজুর রহমান মল্লিকের নাম আলোচনায় এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অতিরিক্ত অর্থ আদায়ের প্রচলিত ব্যবস্থার সঙ্গে তিনি প্রভাবশালী ভূমিকা পালন করেন। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য নেয়ার জন্য ফোন দিলে তিনি ফোন রিসিভ করেননি।
সংস্কারের দাবি
সচেতন নাগরিকদের মতে, ভূমি নিবন্ধন ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে বালাম বই ও পুরোনো রেকর্ড সম্পূর্ণ ডিজিটালাইজেশন, অনলাইনে ফি পরিশোধ বাধ্যতামূলক করা, জাবেদা নকল দ্রুত সরবরাহ, দালালমুক্ত সেবা নিশ্চিত করা এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে পদমর্যাদা নির্বিশেষে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা জরুরি। তাদের ভাষ্য, অন্যথায় সাধারণ মানুষের ভূমির অধিকার ও সরকারি রাজস্ব—উভয়ই ঝুঁকির মুখে থাকবে।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply