
পটুয়াখালীর দশমিনায় আইফোনের জন্য বাবা সন্তানকে এক লক্ষ টাকায় বিক্রি।
এইচ.এম. নুর নবী,পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি।
আইফোন কেনার জন্য এক লাখ টাকার বিনিময়ে নিজের সন্তানকে অন্যের কাছে দিয়ে দিয়েছেন বাবা,পটুয়াখালীর দশমিনা উপজেলার বেতাগী-সানকিপুর ইউনিয়নের বড় গোপালদী গ্রামের মুন্সিবাড়িতে ঘটেছে চাঞ্চল্যকর এ ঘটনা।কিশোর পিতা মারুফমা, তোমার নাতি মুসাকে জামাকাপড় পরিয়ে দাও, আমি ওকে নিয়ে একটু বাজারে ঘুরে আসি,ছেলের এমন কথায় কোনো সন্দেহ হয়নি দাদি মাহফুজা বেগমের। নিজের হাতে আদরের নাতি দেড় বছরের মুসাকে জামাকাপড় পরিয়ে বাবার হাতে তুলে দিয়েছিলেন তিনি। কে জানত, সেই যাওয়াটাই হবে নাতির সঙ্গে তার শেষ দেখা! সকাল গড়িয়ে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত, ফিরে আসেনি ছোট্ট মুসা। একসময় পরিবারের কাছে আসে হৃদয়বিদারক এক অভিযোগ, আইফোন কেনার জন্য এক লাখ টাকার বিনিময়ে নিজের সন্তানকে অন্যের কাছে দিয়ে দিয়েছেন বাবা।
শনিবার (২৯ আগস্ট) সকালে শিশুটিকে নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন তার বাবা মো. মারুফ। তিনি ওই গ্রামের মফিজ মুন্সির ছেলে এবং পেশায় কাঠমিস্ত্রি।
পরিবারের দাবি, শনিবার সকাল ৮টার দিকে মারুফ তার মা মাহফুজা বেগমকে বলেন, মুসাকে জামাকাপড় পরিয়ে দিতে। দাদি কোনো কিছু না ভেবেই নাতিকে সুন্দর করে সাজিয়ে দেন। এরপর বাবা মুসাকে নিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে যান। কিন্তু সময় যত গড়াতে থাকে, পরিবারের উৎকণ্ঠাও তত বাড়তে থাকে। সন্ধ্যা হয়ে গেলেও বাবা-ছেলে বাড়িতে না ফেরায় শুরু হয় খোঁজাখুঁজি। বাজার থেকে শুরু করে আশপাশের বিভিন্ন স্থানে খোঁজ করেও তাদের সন্ধান মেলেনি।
পরে পরিবারের পক্ষ থেকে মারুফের মামা বাহাদুর মিয়াকে বিষয়টি জানানো হয়। পরিবারের ভাষ্য, মারুফকে ঢাকায় তার মামার বাসায় নিয়ে গিয়ে শিশুটির বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে প্রথমে তিনি কোনো কিছু স্বীকার করেননি। পরে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মারুফ স্বীকার করেন বলে পরিবারের দাবি, আইফোন কেনার জন্য তিনি তার দেড় বছরের ছেলে মুসাকে দশমিনা উপজেলার আলীপুর ইউনিয়নের রোমানাথসেন গ্রামের ইমরান হোসেনের কাছে এক লাখ টাকার বিনিময়ে লিখিতভাবে দিয়ে দিয়েছেন।
পরিবারের আরও দাবি, শিশুটিকে দেওয়ার পর এক লাখ টাকা নিয়ে মারুফ ঢাকায় চলে যান এবং সেখানে একটি পুরোনো আইফোন দিয়ে নতুন আইফোন কেনেন।
নাতিকে হারিয়ে দিশেহারা মাহফুজা বেগম বলেন, প্রায় চার বছর আগে তার ছেলে মারুফ ঢাকার সাভার থেকে বৃষ্টি নামে এক তরুণীকে বিয়ে করে বাড়িতে নিয়ে আসেন। প্রায় তিন বছর পর তাদের ঘরে জন্ম নেয় মুসা। কিন্তু প্রায় এক মাস আগে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে পারিবারিক বিষয় নিয়ে কথা-কাটাকাটি হলে বৃষ্টি বাবার বাড়িতে চলে যান। এরপর মারুফ কিছুদিন বাড়িতে থেকে ঢাকায় চলে যান। গত শুক্রবার সন্ধ্যার আগে তিনি বাড়িতে ফেরেন। পরদিন সকালে মুসাকে নিয়ে বের হওয়ার পরই ঘটে যায় এমন ঘটনা।
মাহফুজা বেগমের কণ্ঠে তখন শুধু কান্না আর আকুতি। তিনি বলেন, “আমি তো জানতাম না আমার ছেলে আমার নাতিকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছে। সে শুধু বলেছিল বাজারে ঘুরতে যাবে। আমি নিজের হাতে আমার নাতিকে জামাকাপড় পরিয়ে তার হাতে তুলে দিয়েছি। এখন আমার নাতি কোথায় আছে, কেমন আছে,আমি কিছুই জানি না। আমি আমার নাতিকে ফিরে পেতে চাই। প্রশাসন ও সবার কাছে আমার অনুরোধ, আমার মুসাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন।
এদিকে শিশুটিকে নেওয়ার অভিযোগ ওঠা ইমরান হোসেন মুঠোফোনে জানান, মারুফ দীর্ঘদিন ধরে তার কাছে ছেলেকে দেওয়ার কথা বলে আসছিলেন। তার শ্বশুরের পাঁচটি মেয়ে, কোনো ছেলে সন্তান নেই। এ কারণে মারুফের সঙ্গে আলোচনা করে এক লাখ টাকার বিনিময়ে শিশুটিকে লিখিতভাবে নিয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। পরে শিশুটিকে তার শ্বশুরের বাড়িতে দিয়ে আসেন বলেও জানান ইমরান।
ঘটনার খবর ছড়িয়ে পড়লে পুরো এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়। স্থানীয়দের মধ্যে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ ও উদ্বেগ। এলাকাবাসীর দাবি, দেড় বছরের নিষ্পাপ শিশুটির কোনো অপরাধ নেই। সে জানেই না কেন তাকে আপনজনদের কাছ থেকে দূরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। দ্রুত মুসাকে উদ্ধার করে তার পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন তারা।
দেড় বছরের ছোট্ট মুসা এখন কোথায়,এই প্রশ্নই ঘুরপাক খাচ্ছে তার পরিবারের মনে। যে বয়সে মায়ের আঁচল আর দাদির কোলে থাকার কথা, সেই বয়সেই সে আজ আপনজনদের কাছ থেকে দূরে। বাড়ির উঠানে, ঘরের কোণে, দাদির চোখে,সবখানেই যেন মুসার স্মৃতি। আর দাদি মাহফুজার বুকজুড়ে শুধু একটাই আকুতি,আমার নাতিকে ফিরিয়ে দিন।
এখন মুসার পরিবারের অপেক্ষা, কখন পুলিশ তাকে উদ্ধার করে আবার ফিরিয়ে দেবে দাদির কোলে। সেই সঙ্গে এলাকাবাসীরও প্রত্যাশা,ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত সত্য বেরিয়ে আসুক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হোক।
এ বিষয়ে দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম জানান, অভিযোগ পাওয়ার পর শিশুটিকে উদ্ধারে পুলিশ সরেজমিনে কাজ শুরু করেছে। এ বিষয়ে পরবর্তী আইনগত কার্যক্রম চলমান রয়েছে।
তারিখ,৩০/০৮/২৬:
এইচ.এম.নুর নবী, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি।
মোবাইল,01777042194
Leave a Reply