
অদৃশ্য সুবিধা ও ক্ষমতা বলে বদলির মাত্র পাঁচ মাস না পেরোতেই পুরনো কর্মস্থলে পুনরায় প্রত্যাবর্তন হওয়ায় জেলাজুড়ে চাঞ্চল্য
জাহাঙ্গীর আলম, জেলা প্রতিনিধিঃ
মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ের গোপনীয় সহকারী (সিএ) মো. শরীফ হোসেনকে ঘিরে নানা অভিযোগ ও বিতর্কের মধ্যেই বদলির মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাসের মাথায় পুনরায় আগের কর্মস্থলে প্রত্যাবর্তনের ঘটনায় জেলাজুড়ে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে। যেখানে বাংলাদেশ সরকারের প্রচলিত প্রশাসনিক নীতিমালা অনুযায়ী সাধারণভাবে একজন কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে একই কর্মস্থলে প্রায় ২ থেকে ৩ বছর দায়িত্ব পালনের পর বদলি করা হয়, ও কোন ক্ষেত্রে ৪/৫ বছরও পর বদলি হয়ে থাকে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, ভুক্তভোগী এবং সচেতন মহলের প্রশ্ন—দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর অন্যত্র বদলি হওয়া একজন কর্মচারী কীভাবে এত অল্প সময়ের মধ্যে পুনরায় একই কর্মস্থলে ফিরে এলেন?
অনুসন্ধানে জানা যায়, মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার দক্ষিণ সেওতা এলাকার নিতাই মাস্টারের ছেলে মো. শরীফ হোসেন দীর্ঘদিন ধরে সরকারি চাকরিতে কর্মরত। তিনি পূর্বে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে কর্মরত থাকলেও পরবর্তীতে মানিকগঞ্জ সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে গোপনীয় সহকারী হিসেবে যোগদান করেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নির্দিষ্ট সময় পর বদলির প্রচলিত নীতিমালা থাকা সত্ত্বেও তিনি দীর্ঘ সময় একই কর্মস্থলে বহাল ছিলেন।
স্থানীয় সূত্রের দাবি, সদর উপজেলায় কর্মরত অবস্থায় তিনি বিভিন্ন ইউনিয়নের জনপ্রতিনিধিদের ওপর ব্যাপক প্রভাব বিস্তার করতেন। কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক জনপ্রতিনিধি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন প্রশাসনিক কার্যক্রমে তার অস্বাভাবিক প্রভাব ছিল এবং অনেক ক্ষেত্রে তাদের চাপের মুখে কাজ করতে হয়েছে।
এদিকে গত ২৩ মার্চ ২০২৫ তারিখে মানিকগঞ্জ পৌরসভার উত্তর সেওতা এলাকার বাসিন্দা মো. কালাম মোল্লা দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়ারম্যান বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগপত্রে দাবি করা হয়, মো. শরীফ হোসেন দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থেকে বিভিন্ন অনিয়ম ও দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। অভিযোগে আরও উল্লেখ করা হয়, বিভিন্ন সরকারি প্রকল্প অনুমোদন, বাস্তবায়ন ও বিল পাস সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডে অনিয়মের মাধ্যমে সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অভিযোগকারী আরও দাবি করেন, টিআর, কাবিখা, কাবিটা ও অন্যান্য উন্নয়ন প্রকল্পের বরাদ্দ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার, জনপ্রতিনিধিদের ওপর চাপ সৃষ্টি এবং বিভিন্ন প্রকল্প থেকে অবৈধ সুবিধা গ্রহণের অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের অভিযোগ, বিভিন্ন সময়ে প্রকল্পের বরাদ্দকৃত চাল ও গম কম মূল্যে নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে ক্রয়ের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হতো। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, এ ধরনের কর্মকাণ্ডে আপত্তি জানালে ভয়ভীতি প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে।
ভুক্তভোগীদের দাবি, অভিযোগের পর দুর্নীতি দমন কমিশনের একটি টিম অনুসন্ধান করলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। এ নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্নের সৃষ্টি হয়েছে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হলো, দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর তাকে শিবালয় উপজেলায় বদলি করা হলেও মাত্র পাঁচ থেকে ছয় মাসের মধ্যে পুনরায় মানিকগঞ্জ সদর উপজেলায় পদায়ন করা হয়েছে। স্থানীয়দের প্রশ্ন, একজন কর্মচারী দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে দায়িত্ব পালনের পর পুনরায় একই স্থানে এত দ্রুত প্রত্যাবর্তনের পেছনে কী কারণ কাজ করেছে?
এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও বদলি প্রক্রিয়া নিয়ে জনমনে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। সচেতন মহলের দাবি, বিষয়টি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, জেলা প্রশাসন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা উচিত।
অভিযোগের বিষয়ে গণমাধ্যম কর্মীরা মো. শরীফ হোসেনের বক্তব্য জানতে তার কার্যালয়ে গেলে তিনি অভিযোগ অস্বীকার করেন । অন্যদিকে পুনরায় একই কর্মস্থলে পদায়নের বিষয়ে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়ার চেষ্টা করা হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
স্থানীয় সচেতন নাগরিকদের দাবি, বদলি প্রক্রিয়া, অভিযোগসমূহ এবং পুনরায় পদায়নের নেপথ্যের কারণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে জনসমক্ষে তুলে ধরা হোক। একই সঙ্গে অভিযোগ প্রমাণিত হলে প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়েছে।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply