
সরঞ্জাম বন্দি, সেবা বন্দি কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালে কোটি টাকার যন্ত্র, অসহায় রোগীর দীর্ঘশ্বাস।
মোঃ জাফর আহমেদ কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতাঃ
কুড়িগ্রামের দরিদ্র মানুষের চিকিৎসার শেষ আশ্রয়স্থল ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতাল। অথচ সেই হাসপাতালেই বছরের পর বছর ধুলাবালিতে পড়ে আছে প্রায় ৩৩ কোটি টাকা মূল্যের আধুনিক চিকিৎসা সরঞ্জাম। প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি থাকা সত্ত্বেও রোগীরা পাচ্ছেন না সরকারি হাসপাতালে আধুনিক চিকিৎসাসেবা। ফলে প্রতিদিন অসংখ্য রোগীকে বাধ্য হয়ে উচ্চমূল্যে বেসরকারি ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে হচ্ছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছেন জেলার অসহায় ও নিম্নআয়ের মানুষ।
সরেজমিনে দেখা গেছে, হাসপাতালের বিভিন্ন কক্ষে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে রয়েছে অপারেশন থিয়েটারের যন্ত্রপাতি, ইটিটি-ইকো মেশিন, পোর্টেবল এক্স-রে মেশিন, এন্ডোস্কপি সরঞ্জাম, ডায়াথার্মি মেশিন, ইনফিউশন পাম্প, ডিফিব্রিলেটর, পালস অক্সিমিটার, অর্থোপেডিক সেট, আর্থ্রোস্কোপ, ডপলার হার্ট ডিটেক্টরসহ নানা ধরনের মূল্যবান চিকিৎসা সরঞ্জাম। দীর্ঘ ৬ থেকে ৭ বছর ধরে এসব যন্ত্র ব্যবহার না হওয়ায় একদিকে রোগীরা প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে সরকারের কোটি কোটি টাকার সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১৮-১৯ অর্থবছরে জনস্বাস্থ্য ও পুষ্টি খাত উন্নয়ন কর্মসূচির আওতায় কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের জন্য ১৯৩টি চিকিৎসা সরঞ্জাম কেনা হয়। এসব সরঞ্জামের মোট মূল্য ৩২ কোটি ৯৪ লাখ ৬০ হাজার টাকা। সরঞ্জাম সরবরাহের দায়িত্ব পায় মেসার্স মাইক্রো ট্রেডার্স ও হারমান এন্টারপ্রাইজ।
২০১৯ সালে একটি জরিপ কমিটি এসব সরঞ্জাম গ্রহণ করে। এরপর ১৭২টি যন্ত্রের বিপরীতে প্রায় ১২ কোটি টাকা বিল পরিশোধ করা হয়। তবে অভিযোগ রয়েছে, যন্ত্রগুলো বাস্তবে চালু না হলেও তৎকালীন হাসপাতাল সুপার ডা. শহিদুল্লাহ ২০২৫ সালের জুন মাসে অবশিষ্ট বিল পরিশোধের জন্য সুপারিশ করেন। ওই সুপারিশে উল্লেখ করা হয়, যন্ত্রপাতি সচল রয়েছে এবং রোগীদের চিকিৎসায় ব্যবহার করা হচ্ছে।
পরবর্তীতে বিষয়টি যাচাই করতে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও আজ পর্যন্ত সেই তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি। কেন প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়নি, সে বিষয়েও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কোনো ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি। এতে জনমনে নানা প্রশ্ন ও সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে।
হাসপাতালের কয়েকজন কর্মকর্তা ও কর্মচারী জানান, কিছু এসি ও ফ্রিজ চালু থাকলেও ইকো, ইটিটি ও পোর্টেবল এক্স-রে মেশিনসহ অধিকাংশ গুরুত্বপূর্ণ যন্ত্র কখনোই ব্যবহার করা হয়নি। তাদের অভিযোগ, অনিয়মের মাধ্যমে বকেয়া বিল উত্তোলন ও পরিশোধের চেষ্টা চলছে।
তারা আরও বলেন, এসব যন্ত্র চালু থাকলে কুড়িগ্রামের সাধারণ মানুষ সরকারি হাসপাতালেই স্বল্প খরচে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করাতে পারতেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, প্রতিদিন চিকিৎসকেরা যেসব পরীক্ষা লিখে দেন, তার অধিকাংশই হাসপাতালের ভেতরে করা যায় না। ফলে রোগীদের বাইরে বিভিন্ন ডায়াগনস্টিক সেন্টারে যেতে বাধ্য করা হয়। এতে দরিদ্র পরিবারগুলোকে অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হচ্ছে।
জেলার সচেতন মহলের প্রশ্ন—হাসপাতালে যখন কোটি কোটি টাকার আধুনিক যন্ত্রপাতি রয়েছে, তখন রোগীদের কেন বাইরে পরীক্ষা করতে হবে? যন্ত্রগুলো ইচ্ছাকৃতভাবে অচল রাখা হচ্ছে কি না, কিংবা কোনো সিন্ডিকেট এর পেছনে কাজ করছে কি না—এসব বিষয়েও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি উঠেছে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. নূরে নেওয়াজ আহমেদ বলেন, “ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বকেয়া বিল না পাওয়ার কারণে প্রয়োজনীয় পাসওয়ার্ড সরবরাহ করছে না। এ বিষয়ে আমরা স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে চিঠি দিয়েছি। আগের কর্মকর্তাদের অবহেলার কারণে জেলার মানুষ আধুনিক চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত এসব যন্ত্র চালুর উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।”
তবে সরঞ্জাম সরবরাহকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে ওঠা অনিয়মের অভিযোগের বিষয়ে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
কুড়িগ্রাম বাংলাদেশের অন্যতম দরিদ্র জেলা। এখানকার অধিকাংশ মানুষ সরকারি হাসপাতালের ওপর নির্ভরশীল। অথচ কোটি কোটি টাকার চিকিৎসা সরঞ্জাম বছরের পর বছর অব্যবহৃত পড়ে থাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন এই জেলার অসহায় মানুষ।
জেলার সর্বস্তরের জনগণ দ্রুত তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ, দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ, অব্যবহৃত চিকিৎসা সরঞ্জাম দ্রুত চালু এবং হাসপাতালের আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সরকারের সর্বোচ্চ মহল, বিশেষ করে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply