
দুই দেশে দুই স্ত্রী: খোরশেদের ‘ডাবল গেমে’ জিম্মি জাফলং সীমান্ত
মোঃ আব্দুর রব : সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি
সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার ৩নং পূর্ব জাফলং ইউনিয়নের সীমান্তবর্তী এলাকায় এক মূর্তিমান আতঙ্কের নাম খোরশেদ আলম।
একসময়ের সাধারণ প্রাইভেট কার চালক খোরশেদ এখন রাতারাতি ‘আঙুল ফুলে কলাগাছ’।
অভিযোগ উঠেছে, জেলা ডিবি পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের নাম ভাঙিয়ে সোনাটিলা, গুচ্ছগ্রাম, তামাবিল স্থলবন্দর ও লালামাটি—এই চারটি পয়েন্টে গড়ে তুলেছেন একছত্র পাচার সাম্রাজ্য।
নিজেকে ডিবি পুলিশের ‘লাইনম্যান’ পরিচয় দিয়ে প্রতিদিন হাতিয়ে নিচ্ছেন লাখ লাখ টাকা।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোয়াইনঘাট উপজেলার লাখেরপার এলাকার চা-দোকানী ওহিদ মিয়ার ছেলে খোরশেদ আলমের এই উত্থানের পেছনে রয়েছে এক সুপরিকল্পিত কৌশল।
বাংলাদেশে তার স্ত্রী ও সন্তান থাকলেও ভারতের খাসিয়া সম্প্রদায়ের ‘ডায়না’ নামের এক তরুণীকে বিয়ে করেছেন তিনি।
মূলত এই ভারতীয় স্ত্রীর মাধ্যমেই তিনি সীমান্ত এলাকায় সোনা চোরাচালান ও আদম পাচারের একটি শক্তিশালী আন্তর্জাতিক সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছেন।
একাধিক ভারতীয় সিম কার্ড ব্যবহার করে তিনি নিয়মিত ওপারে যোগাযোগ রক্ষা করেন।
স্থানীয়দের অভিযোগ, খোরশেদ নিজেকে সিলেট জেলা ডিবির (ডিটেকটিভ ব্রাঞ্চ) ওসি এবং সেকেন্ড অফিসারের ‘লাইনম্যান’ হিসেবে পরিচয় দেন।
এই পরিচয় ব্যবহার করে সোনাটিলা, গুচ্ছগ্রাম, তামাবিল ও লালামাটি স্পট থেকে তিনি নিয়মিত চাঁদা আদায় করেন।
ভুক্তভোগীদের দাবি, ডিবির নাম ভাঙিয়ে প্রতিদিন তিনি লাখ লাখ টাকা উত্তোলন করছেন।
সাধারণ ব্যবসায়ী ও এলাকাবাসী তার সিন্ডিকেটের ভয়ে তটস্থ থাকলেও লোকলজ্জা ও পরিণতির ভয়ে কেউ মুখ খোলার সাহস পায় না।
স্থানীয় সূত্র জানায়, খোরশেদ দিনের অধিকাংশ সময় কাটান সীমান্তের ওপারে ভারতীয় স্ত্রী ডায়নার কাছে।
সেখান থেকে তিনি সোনা ও মানুষ পাচারের পাশাপাশি বাংলাদেশে অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র, মাদক ও নিষিদ্ধ বিভিন্ন পণ্য নিয়ে আসেন।
সীমান্ত পাড়ি দেওয়া এখন তার কাছে নিত্যনৈমিত্তিক ব্যাপার হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মাত্র কয়েক বছরের ব্যবধানে একজন সাধারণ চালক থেকে বিলাসবহুল জীবনযাপন ও অগাধ সম্পদের মালিক হওয়া নিয়ে এলাকায় নানা গুঞ্জন চলছে।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত খোরশেদ আলমের সাথে যোগাযোগ করা হলে তিনি চোরাচালানের অভিযোগ অস্বীকার করেন।
তবে তিনি স্বীকার করেন যে, তার ভারত ও বাংলাদেশ—উভয় দেশেই স্ত্রী রয়েছে।
মুঠোফোনে আলাপকালে তিনি নিজেকে নির্দোষ দাবি করে আশরাফুল নামের এক ব্যক্তিকে ফোন ধরিয়ে দেন।
সিলেট নগরীর মাছিমপুর এলাকার বাসিন্দা পরিচয় দিয়ে আশরাফুল বলেন, খোরশেদ কেবল সীমান্তে চোরাচালানের ‘টুকটাক ব্যবসা’ করে।
ভারতে যাওয়া প্রসঙ্গে খোরশেদ বলেন, আমি ভারতে যাই না, আমার ভারতীয় স্ত্রী ডায়নাই বাংলাদেশে আসে।
এ বিষয়ে সিলেট জেলা ডিবির ওসি আলী আশরাফ কঠোর হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, ডিবি পুলিশের কোনো ‘লাইনম্যান’ নেই।
যারা ডিবির নাম ভাঙিয়ে অবৈধভাবে চাঁদাবাজি বা অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হবে, তাদের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি গ্রহণ করা হবে।
এসব অপরাধীদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।
খোরশেদের এই বেপরোয়া কর্মকাণ্ডের ফলে সীমান্তবর্তী অঞ্চলের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি চরম ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
ডিবির নাম ব্যবহার করে সীমান্ত অপরাধ এবং চোরাচালান বন্ধে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি হস্তক্ষেপ ও কঠোর অভিযান পরিচালনার দাবি জানিয়েছেন সচেতন এলাকাবাসী।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply