
মাদক মামলার চার্জশিটেও জালিয়াতি! ঘুষ নিয়ে আসামিকে দেশছাড়া করলেন দুই কর্মকর্তা
সাজেদুর রহমান রংপুর প্রতিনিধি
কয়েক লাখ টাকা ঘুষ নিয়ে রংপুরের এক শীর্ষ মাদক কারবারির মামলার চার্জশিটে তথ্য জালিয়াতি এবং পুলিশের অপরাধ রেকর্ড থেকে নাম মুছে তাকে বিদেশে পালাতে সহায়তার চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্তরা হলেন—মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) রংপুর বিভাগীয় গোয়েন্দা কার্যালয়ের উপপরিচালক দিলারা রহমান এবং উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মেহেদুল ইসলাম সরদার।অন্যদিকে, কৌশলে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়া ওই মাদক কারবারি হলেন মিঠাপুকুর উপজেলার বালুচর কাশিনাথপুর এলাকার হাতিমপুর গ্রামের আব্দুল লতিফের ছেলে মো. মোরছালিন মিয়া (৩২)।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, মিঠাপুকুর এলাকায় দীর্ঘ দিন ধরে বড় আকারের মাদক সিন্ডিকেট পরিচালনা করে আসছিলেন মোরছালিন মিয়া। মাদক ব্যবসার মাধ্যমে তিনি এলাকায় কোটি কোটি টাকার অবৈধ সম্পত্তি ও বিপুল সম্পদ গড়ে তুলেছেন বলে স্থানীয়দের অভিযোগ রয়েছে।
তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মাদক মামলার আইনি জটিলতা এড়াতে তিনি ডিএনসি কর্মকর্তাদের বড় অঙ্কের ঘুসের প্রস্তাব দেন। এতে প্রলুব্ধ হয়ে উপপরিচালক ও এসআই মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) দাখিলের সময় চতুরতার আশ্রয় নেন। তারা মোরছালিনের নাম ও তথ্য ভুল কলামে বসিয়ে দেন, যার ফলে আদালতের ডিজিটাল সফটওয়্যারে তার নাম প্রক্রিয়াজাত হওয়া থেকে বাদ পড়ে যায়।
এর সরাসরি প্রভাবে পুলিশের কেন্দ্রীয় অপরাধ ডাটাবেজ বা ‘পিসিপিআর’ (পূর্ববর্তী অপরাধের রেকর্ড) থেকে মোরছালিন মিয়ার নাম স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাদ পড়ে যায়। এই সুযোগে কোনো ধরনের আইনি বা প্রশাসনিক বাধা ছাড়াই ওই মাদক কারবারি নিরাপদে বিদেশে পাড়ি জমান।
মোরছালিনের প্রতিবেশী মুশফিকুর তার বিরুদ্ধে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক প্রকাশ করে বলেন,মোরছালিন এলাকার যুবসমাজকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সে প্রায়ই দম্ভ করে বলত—টাকা দিয়ে পুলিশ, উকিল ও আদালতকে কিনে নেয় সে, তাকে কেউ আটকাতে পারবে না। একসময় সে আমার হাত ভেঙে দিয়েছিল এবং আমার স্ত্রীর মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল।
অভিযোগপত্র ও অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে, এই ঘটনার সূত্রপাত গত বছরের ৮ জুলাই। ওই দিন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার জুমা খানপাড়ায় একটি বিশেষ অভিযান চালায় ডিএনসি’র একটি দল। অভিযানকালে ৮৭০ গ্রাম ওজনের ৯ হাজার পিস ইয়াবাসহ নাজমা বেগম (২৬) নামের এক নারীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে অভিযানের সময় নাজমার স্বামী খালেদ খান এবং এই মাদক চালানের অন্যতম মূল হোতা মোরছালিন মিয়া কৌশলে পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় ডিএনসি’র এসআই মো. আলমগীর হোসেন বাদী হয়ে মিঠাপুকুর থানায় একটি মাদক মামলা দায়ের করেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) রংপুর কার্যালয়ের উপপরিচালক দিলারা রহমান ও উপপরিদর্শক মো. মেহেদুল ইসলাম সরদারের বিরুদ্ধে চার্জশিটে তথ্য জালিয়াতির মাধ্যমে শীর্ষ মাদক কারবারিকে বিদেশে পালাতে সহায়তার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে। তদন্তকালে আসামিদের নাম চার্জশিটের দোষী তালিকার পরিবর্তে অব্যাহতির তালিকায় যুক্ত করায় আদালতের সফটওয়্যার ব্যবস্থার মাধ্যমে তারা অপরাধ রেকর্ড থেকে অব্যাহতি পান।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) রংপুর কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে একটি মাদক মামলার তদন্ত প্রতিবেদনে ব্যাপক জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট তথ্য প্রকাশ পেয়েছে। মামলার মূল এজাহারে কক্সবাজার থেকে ইয়াবা এনে মজুত করার মতো গুরুতর অপরাধের বিবরণ থাকলেও, চূড়ান্ত চার্জশিটে প্রধান কারবারি মোরছালিনকে কেবল সহযোগিতাকারী’ হিসেবে দেখিয়ে অপরাধের মাত্রা লাঘব করা হয়।এছাড়া তদন্তে চরম গাফিলতি ও জালিয়াতির প্রমাণ হিসেবে, অভিযুক্ত মাদক কারবারি মোরছালিনের জীবিত বাবাকেও তদন্ত প্রতিবেদনে মৃত হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। ভুল কলামে নাম বসানো এবং বাবার তথ্য বিকৃতির মাধ্যমে আসামিকে আইনি প্রক্রিয়া থেকে ছাড় দিয়ে পুলিশের অপরাধ ডাটাবেজ (পিসিপিআর) থেকে মুক্ত করতে এই অনৈতিক কৌশল নেওয়া হয়।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, কর্মকর্তাদের তৈরি করে দেওয়া এই আইনি ছাড়ের সুযোগ পুরোপুরি কাজে লাগান মোরছালিন। পিসিপিআর থেকে নাম বাদ পড়ার পরপরই গত ২১ আগস্ট সানজিলা মুনতাসির ট্রাভেলসের মাধ্যমে ওমরাহ ভিসায় ইউএস-বাংলার একটি ফ্লাইটে তিনি সৌদি আরব চলে যান। ১৯ সেপ্টেম্বর তার দেশে ফেরার কথা থাকলেও, তিনি আর ফেরেননি এবং সেখানে স্থায়ীভাবে থেকে যাওয়ার চেষ্টা চালাচ্ছেন বলে জানা গেছে।
এই জঘন্য জালিয়াতির ঘটনায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) রংপুরের সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, চার্জশিটে ভুল কলামে নাম দিয়ে আসামিকে পালানোর সুযোগ দেওয়ার পেছনে তদন্তকারী কর্মকর্তা ও স্বাক্ষরকারী ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা— উভয়েই সমান অপরাধী। এটি সরকারি চাকরি বিধিমালার চরম লঙ্ঘন। তাদের বিরুদ্ধে অবিলম্বে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
অভিযুক্ত উপপরিদর্শক (এসআই) মো. মেহেদুল ইসলাম সরদার তার বিরুদ্ধে ওঠা ঘুস গ্রহণের অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করেছেন। তিনি দাবি করেন, তদন্ত শেষে আদালতে চার্জশিট জমা দেওয়ার মাধ্যমেই তাদের দায়িত্ব শেষ হয়ে যায়। ইতিপূর্বে সিরাজগঞ্জেও তিনি একইভাবে চার্জশিট দাখিল করেছেন এবং সেখানে কোনো ধরনের সমস্যা বা জটিলতা তৈরি হয়নি। এছাড়া তদন্ত প্রতিবেদনে আসামির বাবার নাম ভুলের বিষয়ে তিনি জানান, পূর্ববর্তী রিপোর্টের তথ্যের ওপর ভিত্তি করেই এই ভুলটি হয়েছে।
কোর্টের সিএসআই (কোর্ট সাব-ইন্সপেক্টর) এএফএম সাখাওয়াত হোসেন এই জালিয়াতির আইনি ও কারিগরি দিকটি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। তিনি জানান, অভিযোগপত্রের ভেতরে আসামিদের অপরাধী হিসেবে উল্লেখ করা হলেও মূল বিবরণীর অব্যাহতির কলামে নাম বসানোর কারণে ডিজিটাল সফটওয়্যার তাদের অব্যাহতিপ্রাপ্ত হিসেবে গ্রহণ করেছে।
ঘুষ গ্রহণের বিষয়টি সম্পূর্ণ অস্বীকার করে এসআই মেহেদুল ইসলাম সরদার দাবি করেন,আমরা তো আদালতে চার্জশিট জমা দিয়েই দায় শেষ করি।এর আগে সিরাজগঞ্জেও এভাবে চার্জশিট দিয়েছি, কোনো সমস্যা হয়নি। বাবার নামের ভুলের বিষয়টি আগের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করে হয়েছে।
Leave a Reply