
দশমিনা হাজিরহাটে তেঁতুলিয়ার নদীর স্রোতে নদীভাঙন, ও বসত ঘর সহ বিলীন ২০টি মত কবর।
এইচ.এম.নুর.নবী, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি।
পটুয়াখালীর দশমিনায় তেঁতুলিয়া নদীর পানি বৃদ্ধি ও তীব্র স্রোতে হাজিরহাট এলাকায় ভয়াবহ নদীভাঙন দেখা দিয়েছে।
আজ মঙ্গলবার (৮ সেপ্টেম্বর) সন্ধ্যার ৭টার পর হাজিরহাট জামে মসজিদের পশ্চিম-উত্তর পাশে নদীর তীব্র স্রোতে সড়কের একটি অংশ ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) দেওয়া জিওব্যাগ নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যায়। এ সময় অন্তত ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ভাঙনের খবর পেয়ে তাৎক্ষণিক ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা এবং দশমিনা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. আতিকুল ইসলাম।
সরেজমিনে দেখা যায়, হাজিরহাট লঞ্চঘাটের পশ্চিম-উত্তর পাশে নদীর তীর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ডের ফেলা শতাধিক জিওব্যাগ তীব্র স্রোতের টানে ধসে নদীতে তলিয়ে গেছে। একই সঙ্গে সংলগ্ন পাকা সড়কের পিচ ও মাটি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে সড়কের সঙ্গে নদীর সংযোগস্থলে বড় ধরনের ভাঙন সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে যেকোনো মুহূর্তে হাজিরহাট জামে মসজিদ, বাজারের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ও আশপাশের বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। রাতে ভাঙন আরও তীব্র হলে জোয়ারের পানিতে আশপাশের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা করছেন তারা।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক দিন ধরেই তেঁতুলিয়া নদীতে পানির চাপ ও তীব্র স্রোতের কারণে হাজিরহাট লঞ্চঘাট ও মসজিদসংলগ্ন নদীর তীরে ধস শুরু হয়। ভাঙন ঠেকাতে পানি উন্নয়ন বোর্ডের পক্ষ থেকে জিওব্যাগ ফেলা হলেও স্রোতের টানে সেগুলোও নদীতে তলিয়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি সড়কের কার্পেটিং ও মাটি ধসে পড়ায় যোগাযোগব্যবস্থা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
ভাঙনের মুখে থাকা স্থানীয় বাসিন্দা নিজামুদ্দিন বলেন, আজ রাতের মধ্যে আমাদের ঘরবাড়ি নদীতে বিলীন হয়ে যেতে পারে। আমার থাকার মতো কোনো জায়গা নেই। তাই স্থানীয় লোকজনের সহযোগিতায় তাৎক্ষণিকভাবে ঘরের মালামাল সরিয়ে নিয়েছি। রাতে হয়তো অন্যের বাড়িতে আশ্রয় নিতে হবে। আমার বাবা খলিল মিয়া গত বছর মারা গেছেন। আমাদের পারিবারিক কবরস্থানও ঝুঁকিতে রয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে বাবার ও দাদার কবরের মরদেহ সরিয়ে পারিবারিক কবরস্থানে পুনরায় দাফনের ব্যবস্থা করব।”
তিনি আরও বলেন, সন্ধ্যার তীব্র ভাঙনে প্রায় ২০টি কবর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। সেগুলো রক্ষা করার মতো সময় বা সুযোগ তারা পাননি। দ্রুত নদীভাঙন রোধে সরকার ও উপজেলা প্রশাসনের কাছে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান তিনি।
ভাঙনের মুখে থাকা কয়েকজন গৃহবধূ বলেন, “এই ভাঙনের পর আমাদের থাকার কোনো জায়গা নেই। জানি না আজ রাত কীভাবে কাটবে। আমাদের স্বজনদের কবরও নদীতে বিলীন হয়ে গেছে। রাতের মধ্যে ঘরবাড়িও ভেঙে যেতে পারে। আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত সাহায্যের আবেদন জানাচ্ছি।”
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দ্রুত কার্যকর ও টেকসই নদীশাসন এবং তীররক্ষা বাঁধ নির্মাণ করা না হলে দশমিনা উপজেলার অন্যতম প্রধান বাণিজ্যিক কেন্দ্র হাজিরহাট বাজার ও ঐতিহ্যবাহী হাজিরহাট জামে মসজিদও হুমকির মুখে পড়বে। তারা দ্রুত জিওব্যাগ ডাম্পিং জোরদার এবং স্থায়ী নদী প্রতিরক্ষা বাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ড ও স্থানীয় প্রশাসনের জরুরি হস্তক্ষেপ দাবি করেছেন।
ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে দশমিনা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহমুদ হাসান মৃধা বলেন, স্থানীয়দের মাধ্যমে সংবাদ পেয়ে আমি ঘটনাস্থল পরিদর্শনে আসি। এখানে এসে দেখলাম, নদীর তীব্র স্রোতে রাতের মধ্যেই সড়কের বাকি সংযোগটুকুও ভেঙে নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে। বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে পটুয়াখালী পানি উন্নয়ন বোর্ডের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের অবহিত করেছি এবং দ্রুত প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম নিয়ে কাজ শুরু করার জন্য অনুরোধ জানিয়েছি।”
তিনি আরও বলেন, নদীতীরবর্তী ভাঙনকবলিত এলাকার ঝুঁকিপূর্ণ বাড়িঘর থেকে কয়েকটি পরিবারকে সরিয়ে ইউনিয়ন পরিষদ ও সাইক্লোন শেল্টারে আশ্রয় নেওয়ার জন্য বলা হয়েছে। তাদের খাবারের ব্যবস্থাও করা হবে। নদীভাঙনে যেসব পরিবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে বসতভিটা ও জমিজমা হারাবেন, তাদের পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি।
স্থানীয়দের দাবি, ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে জিওব্যাগ ফেলা, সড়ক ও নদীর তীর রক্ষার পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি ও স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প গ্রহণ করা না হলে হাজিরহাটের বাজার, মসজিদ, সড়ক ও বসতবাড়ি রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
তারিখ,০৮/০৯/২৬:
এইচ.এম.নুর.নবী, পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি ।
মোবাইল:01777042194
Leave a Reply