
শিক্ষা ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় শত্রু/ সংকট শিক্ষামন্ত্রী বা প্রশ্নের কঠিনতা নয়, শেখার প্রতি অনীহা,মোবাইল আসক্তি, শৃঙ্খলার সাথে পরিশ্রমের অভাবই শিক্ষার্থীদের পিছিয়ে পড়ার অন্যতম কারণ।
—————————————————————————-
গত এক দশকেরও বেশি সময়ে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থায় নানা পরিবর্তন এসেছে। কোভিড-১৯ মহামারির সময় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন বন্ধ ছিল; শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে অটোপাস, বিকল্প মূল্যায়ন ও অ্যাসাইনমেন্টভিত্তিক মূল্যায়নের মতো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছিল। সে সময়ের বাস্তবতায় এগুলো প্রয়োজনীয় ছিল। তবে সংকটকালীন ব্যবস্থা দীর্ঘমেয়াদে চলতে থাকলে শিক্ষার্থীদের নিয়মিত পড়াশোনা, আত্মনির্ভরশীলতা এবং প্রতিযোগিতামূলক প্রস্তুতির ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
আজ যখন শ্রেণিকক্ষে নিয়মিত উপস্থিতি, পাঠ্যবইভিত্তিক প্রস্তুতি, নকলমুক্ত পরীক্ষা এবং প্রকৃত মেধার মূল্যায়নের ওপর আবার জোর দেওয়া হচ্ছে, তখন অনেক শিক্ষার্থীর কাছে এটি কঠিন মনে হওয়াই স্বাভাবিক। কারণ দীর্ঘদিন তুলনামূলক সহজ মূল্যায়ন ব্যবস্থায় অভ্যস্ত একজন শিক্ষার্থীর জন্য শৃঙ্খলাভিত্তিক পরিবেশে ফিরে আসা সহজ নয়।অন্যদিকে ২০১৮-২০২৬ এই সময়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও মোবাইল আসক্তি আমাদের শিক্ষার্থীদের তাদের মূল স্রোত হতে সরিয়ে দিয়েছে যা ভয়ংকর আকার ধারন করেছে।
কিন্তু বাস্তবতা হলো—বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি, বিসিএস, ব্যাংক নিয়োগ, সরকারি-বেসরকারি চাকরি কিংবা আন্তর্জাতিক উচ্চশিক্ষা—কোথাও অটোপাস, বিশেষ সুবিধা বা মানবিক নম্বর কাজ করে না। সেখানে মূল্যায়িত হয় একজনের প্রকৃত জ্ঞান, দক্ষতা, সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা এবং পরিশ্রম।
তাই আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার মূল লক্ষ্য হওয়া উচিত এমন শিক্ষার্থী তৈরি করা, যারা শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করবে না; বরং যুক্তিবাদী, সৃজনশীল, প্রযুক্তি-সচেতন, নৈতিক এবং দায়িত্বশীল নাগরিক হিসেবে দেশকে নেতৃত্ব দেবে। সনদের চেয়ে দক্ষতার মূল্য, মুখস্থবিদ্যার চেয়ে অনুধাবন এবং নম্বরের চেয়ে বাস্তব জ্ঞানকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার সময় এখনই।
একই সঙ্গে মনে রাখতে হবে, শুধু শ্রেণিকক্ষের পাঠদান একজন শিক্ষার্থীকে পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে না। সহশিক্ষা (Co-curricular) কার্যক্রম—যেমন বিতর্ক, বিজ্ঞান মেলা, গণিত অলিম্পিয়াড, স্কাউট, বিএনসিসি, ক্রীড়া, সাংস্কৃতিক চর্চা, রোবোটিক্স, স্বেচ্ছাসেবামূলক কার্যক্রম ও নেতৃত্ব বিকাশমূলক আয়োজন—শিক্ষার্থীর আত্মবিশ্বাস, যোগাযোগ দক্ষতা, দলগত কাজের সক্ষমতা, নেতৃত্ব, শৃঙ্খলাবোধ ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে তোলে। তাই প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়মিত ক্লাস ও পরীক্ষার পাশাপাশি পরিকল্পিত সহশিক্ষা কার্যক্রমকে শিক্ষা ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।
শিক্ষার্থীদের প্রতি আহ্বান—কঠিন পরীক্ষাকে ভয় নয়, নিজের যোগ্যতা প্রমাণের সুযোগ হিসেবে দেখো। আর নীতিনির্ধারকদের প্রতি প্রত্যাশা—শৃঙ্খলার পাশাপাশি মানসম্মত পাঠদান, দক্ষ শিক্ষক, আধুনিক ল্যাব, সমৃদ্ধ লাইব্রেরি, ডিজিটাল শিক্ষার সুযোগ এবং সহশিক্ষা কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজনীয় অবকাঠামো নিশ্চিত করুন। কারণ শুধু কঠোর পরীক্ষা নয়, মানসম্মত শিক্ষা এবং দক্ষতা-ভিত্তিক শিক্ষা ব্যবস্থাই একটি জাতিকে বিশ্ব প্রতিযোগিতায় এগিয়ে নিয়ে যেতে পারে।
আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের বাংলাদেশ। তাদের হাতে শুধু একটি সনদ নয়, জ্ঞান, দক্ষতা, মানবিকতা ও নেতৃত্বে সমৃদ্ধ একটি উন্নত বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্ন তুলে দেওয়াই হওয়া উচিত আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার প্রধান লক্ষ্য।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply