
বাড়ছে করতোয়ার পানি, আতঙ্কে আশ্রয়ণের শতাধিক পরিবার
একদিন যে ঘর ছিল নতুন জীবনের স্বপ্ন, আজ সেই ঘরই পরিণত হয়েছে আতঙ্কের ঠিকানায়। মাথা গোঁজার নিরাপদ আশ্রয়ণ প্রকল্পের ঘরগুলো এখন করতোয়া নদীর ভাঙনের মুখে। চোখের সামনে নদী গিলে খাচ্ছে পাড়ের মাটি। প্রতিদিন একটু একটু করে ভাঙন এগিয়ে আসছে। অনিশ্চয়তায় দিন কাটছে দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলার করতোয়া নদীতীরবর্তী বাসিন্দাদের।
উপজেলার বুলাকিপুর ইউনিয়নের কুলানন্দনপুর নাপিতপাড়া এলাকায় দেখা দিয়েছে এমন পরিস্থিতি। বাসিন্দাদের চোখে এখন একটাই প্রশ্ন, কখন নদীতে বিলীন হবে তাদের শেষ আশ্রয়টুকু।
স্থানীয়রা জানান, টানা কয়েক দিনের ভারী বৃষ্টিতে করতোয়া নদীর পানি বেড়ে যাওয়ার পর ভাঙন তীব্র আকার ধারণ করেছে। নদীর তীর ধসে পানি আশ্রয়ণ প্রকল্পের কাছাকাছি চলে এসেছে। ইতোমধ্যে প্রকল্পের কয়েকটি ঘর ঝুঁকির মধ্যে পড়েছে। যেকোনো সময় বড় ধরনের ভাঙনে এসব ঘর নদীগর্ভে বিলীন হয়ে যেতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বাসিন্দারা।
আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা আদরী রাণী বলেন, ‘আমরা খুব কষ্টে আছি। আমরা গরিব মানুষ। আমাদের কোনো জায়গা নেই। এখানে আরও ঘর ছিল, সেগুলো ভেঙে নদীতে চলে গেছে। ১৫ থেকে ২০ দিন ধরে ভাঙন খুব বেড়ে গেছে। আমাদের জায়গা কেনার সামর্থ্য নেই। ছোট বাচ্চারা কখন নদীতে পড়ে যায়, সেই চিন্তায় থাকি। রান্না করে খাবার খেতেও পারছি না। খুব চিন্তায় আছি।’
আরেক বাসিন্দা সুরাইয়া বেগম বলেন, ‘নদীভাঙনের কারণে আমরা ঘরবাড়ি খুলে সরাতেও পারিনি। আমাদের টাকা-পয়সা নেই। নতুন করে ঘর করতে পারছি না, জায়গাও কিনতে পারছি না। রাত হলেই ভয় লাগে, কখন ঘর নিয়ে নদীতে চলে যায়।’
নদীতীরের বাসিন্দা আদরী রাণী বলেন, ‘বৃষ্টি শুরু হলেই বুক ধড়ফড় করে। অনেক কষ্টের পর সরকার আমাদের থাকার জন্য এই ঘর দিয়েছে। এই ঘরই এখন হারানোর ভয় হচ্ছে। রাতে ঘুমাতে পারি না। কখন নদী সব নিয়ে যায়, সেই আতঙ্কে থাকি। আমাদের নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হোক।’
সরেজমিনে দেখা যায়, নদীর পাড়ের বড় বড় অংশ ধসে পড়ছে। কোথাও কোথাও মাটিতে ফাটল দেখা দিয়েছে। শিশুদের চলাচলও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। আতঙ্কে অনেকে রাতে জেগে থাকছেন। ভাঙন অব্যাহত থাকলে আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশাপাশি আশপাশের শতাধিক পরিবারও গৃহহীন হয়ে পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয়দের দাবি, জরুরি ভিত্তিতে করতোয়া নদীর তীর সংরক্ষণে জিওব্যাগ ফেলা, স্থায়ী নদীশাসন প্রকল্প গ্রহণ এবং ঝুঁকিতে থাকা পরিবারগুলোকে নিরাপদ স্থানে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করতে হবে।
ঘোড়াঘাট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুবানা তানজিন বলেন, ‘নদীর তীর ভেঙে যাচ্ছে। অনেক দিন ধরেই ভাঙন চলছে। আমরা সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখতে এসেছি। ইতোমধ্যে পানি উন্নয়ন বোর্ডের মাধ্যমে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে দ্রুত কাজ শুরু করার উদ্যোগ নেওয়া হবে। বালুর বস্তা ফেলে ব্লকের মতো করে নদীভাঙন রোধে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে সমন্বয় করে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা চলছে।’
করতোয়ার ভাঙন ঠেকাতে দ্রুত উদ্যোগ চান আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দারা। তাদের আশঙ্কা, সময়মতো ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আবারও নদীর স্রোতে হারিয়ে যাবে শতাধিক বাড়িঘর। ঠিকানাহীন হয়ে পড়বে বহু পরিবার।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply