
শিরোনাম:
কাগজে ছাত্রী, বাস্তবে শূন্য শ্রেণিকক্ষ! জাল স্বাক্ষর, বিতর্কিত নিয়োগ ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগে কেন্দ্রে প্রধান শিক্ষক আসাদুজ্জামান
উপশিরোনাম:
সাত নিয়োগ বাতিলের নথি, লাখ লাখ টাকা গ্রহণের লিখিত অভিযোগ এবং শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন— কুঞ্জ মহিপুর বালিকা বিদ্যালয়ের অনিয়ম নিয়ে বাড়ছে বিতর্ক; ধারাবাহিক অনুসন্ধানে উঠে আসছে নতুন তথ্য।
নিজস্ব প্রতিবেদক | গাইবান্ধা
গাইবান্ধার সাদুল্যাপুর উপজেলার কুঞ্জ মহিপুর দ্বি-মুখী বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়কে ঘিরে সামনে এসেছে নিয়োগ জালিয়াতি, নথি কারসাজি, শিক্ষার্থী সংকট এবং অর্থ লেনদেনের একাধিক গুরুতর অভিযোগ। প্রাপ্ত অভিযোগপত্র, সরকারি নথি এবং সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়টির বিভিন্ন শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগ প্রক্রিয়াকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিন ধরে অনিয়মের অভিযোগ চলে আসছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামান।
অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান), অফিস সহকারী, নৈশপ্রহরী ও আয়া পদে নিয়োগের ক্ষেত্রে ব্যবহৃত বিভিন্ন রেজুলেশন, খসড়া প্যাড এবং নিয়োগ-সংক্রান্ত নথিপত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। পরবর্তীতে নথিপত্র যাচাই-বাছাইয়ের পর নিয়োগ প্রক্রিয়ার বৈধতা নিয়ে গুরুতর আপত্তি উত্থাপিত হয়।
অভিযোগ রয়েছে, নিয়োগ বোর্ডে উপস্থিত থাকার কথা ছিল এমন একাধিক কর্মকর্তার স্বাক্ষর জাল করে নিয়োগ-সংক্রান্ত নথি প্রস্তুত ও দাখিল করা হয়। অভিযোগ অনুযায়ী, ডিজি’র প্রতিনিধি, শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের স্বাক্ষর ব্যবহার করে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন দেখানো হয়। পরবর্তীতে বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পর্যালোচনা করে।
প্রাপ্ত নথি অনুযায়ী, পরবর্তীতে সাতটি নিয়োগ বাতিল করা হয়। ফলে দীর্ঘদিন ধরে চাকরির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকা সাতজন শিক্ষক ও কর্মচারীর ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তার মুখে পড়ে।
নথিতে যাদের নিয়োগ বাতিল হয়েছে বলে উল্লেখ রয়েছে তারা হলেন—
১. মো. হারুন-অর-রশিদ, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান)
২. মো. আতিকুর রহমান, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান)
৩. এ.জি.এম. মোস্তাক আহমেদ, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান)
৪. মোছা. ছাবিনা ইয়াসমিন, সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান)
৫. মো. জাকিরুল ইসলাম, অফিস সহকারী
৬. মো. রফিকুল ইসলাম, নৈশপ্রহরী
৭. মোছা. ছামছুন্নাহার, আয়া
এদিকে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. হারুন-অর-রশিদ কর্তৃক দাখিলকৃত একটি লিখিত অভিযোগে প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের বিরুদ্ধে চাকরিসংক্রান্ত বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি দিয়ে তার নিকট থেকে ৬ লাখ টাকা গ্রহণের অভিযোগ আনা হয়েছে। অভিযোগকারী দাবি করেছেন, প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী সুবিধা না পাওয়ায় তিনি অর্থ ফেরতও পাননি। তবে অভিযোগের সত্যতা যাচাই এবং বিষয়টির আইনগত নিষ্পত্তি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের তদন্তের বিষয়।
স্থানীয় একাধিক সূত্রের দাবি, বিদ্যালয়টিতে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগকে কেন্দ্র করে কোটি টাকারও বেশি অর্থ লেনদেন হয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এবং আইনগত সত্যতা এখনও নিশ্চিত হয়নি।
অনুসন্ধানে আরও উঠে এসেছে শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন। প্রতিবেদক দল একাধিক দিন বিদ্যালয় ও আশপাশের এলাকায় অবস্থান করে সরেজমিনে বিদ্যালয়ে কোনো ছাত্রী উপস্থিতি দেখতে পায়নি বলে অনুসন্ধান সূত্রে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বাস্তবে শিক্ষার্থী সংকট থাকলেও কাগজ-কলমে শিক্ষার্থীর সংখ্যা দেখিয়ে বিদ্যালয়ের কার্যক্রম পরিচালনা করা হচ্ছে।
এছাড়াও অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন কোচিং সেন্টারের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে যোগাযোগ করে বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী হিসেবে দেখিয়ে এসএসসি পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করানোর প্রক্রিয়া চালু রয়েছে। যদিও এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট শিক্ষা কর্তৃপক্ষের তদন্ত ও যাচাই প্রয়োজন।
স্থানীয় শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহলের প্রশ্ন, যেখানে শিক্ষার্থী উপস্থিতি নিয়েই গুরুতর প্রশ্ন রয়েছে, সেখানে ধারাবাহিকভাবে একাধিক শিক্ষক ও কর্মচারী নিয়োগের প্রয়োজনীয়তা কীভাবে সৃষ্টি হলো? একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় জাল স্বাক্ষর ও নথি কারসাজির অভিযোগ সত্য হলে এর দায়ভার কে নেবে— এমন প্রশ্নও উঠছে।
শিক্ষা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য প্রমাণিত হলে এটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বরং শিক্ষা ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং সরকারি নিয়োগ প্রক্রিয়ার ওপর আস্থার জন্যও বড় ধরনের হুমকি।
এলাকাবাসীর দাবি, পুরো ঘটনাটি নিরপেক্ষ ও উচ্চ পর্যায়ের তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করা হোক, প্রকৃত দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক এবং ক্ষতিগ্রস্তদের বিষয়েও যথাযথ সিদ্ধান্ত নেওয়া হোক।
অভিযোগের বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মো. আসাদুজ্জামানের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে তার বক্তব্য পাওয়া গেলে তা গুরুত্বের সঙ্গে প্রকাশ করা হবে।
প্রাপ্ত সরকারি নথি, অভিযোগপত্র, সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য এবং সরেজমিন অনুসন্ধানের ভিত্তিতে প্রতিবেদনটি প্রস্তুত করা হয়েছে।
জাতীয় সাপ্তাহিক তদন্ত রিপোর্ট-এর ধারাবাহিক অনুসন্ধান অব্যাহত রয়েছে। আগামী পর্বে থাকছে— সভাপতি স্বাক্ষর জালিয়াতির অভিযোগ, নিয়োগ বোর্ডের নথিতে অসঙ্গতি, কথিত অর্থ লেনদেনের বিস্তারিত তথ্য এবং বিদ্যালয় পরিচালনা নিয়ে আরও বিস্ফোরক অভিযোগের অনুসন্ধান।
(চলবে…)
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply