
দিনে অবহেলা, রাতে নির্যাতন — গাইবান্ধায় ‘বস্তা পাগলি’ নামে পরিচিত এক নারীর মানবেতর জীবন যাপন
রানা ইস্কান্দার রহমান।
গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধ।
গাইবান্ধা শহরের ব্যস্ত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এলাকা—গাইবান্ধা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় ও গাইবান্ধা ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের আশপাশে দীর্ঘদিন ধরে এক অসহায় নারীর মানবেতর জীবনযাপনের ঘটনা স্থানীয়দের নজরে এলেও কার্যকর কোনো উদ্যোগ এখনো দেখা যায়নি। স্থানীয়দের কাছে তিনি “বস্তা পাগলি” নামে পরিচিত হলেও তার প্রকৃত পরিচয় জমিলা বেগম ।
জানা যায়, প্রায় ২০০৩ সাল থেকে তিনি এই এলাকাতেই অবস্থান করছেন। শহরের বিভিন্ন দেয়ালের পাশে বা রাস্তার ধারে বসবাস করলেও তার কোনো স্থায়ী আশ্রয় নেই। দীর্ঘ প্রায় দুই দশক ধরে তিনি এই এলাকায় মানবেতর জীবনযাপন করে আসছেন।
স্থানীয়দের সাথে কথা বলে জানা যায়, দিনের বেলায় অনেকেই তাকে এড়িয়ে চলেন। অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে থাকার কারণে তার শরীর ও পোশাকের অবস্থা অত্যন্ত নাজুক। ফলে অনেকেই তার কাছে যেতে চান না। কিন্তু রাত নামার পর পরিস্থিতি ভিন্ন হয়ে যায়। অভিযোগ রয়েছে, অন্ধকারের সুযোগে সমাজের কিছু অসাধু ব্যক্তির মাধ্যমে তিনি বিভিন্ন সময় যৌন হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
সবচেয়ে দুঃখজনক বিষয় হলো—তার জন্য কোনো নিয়মিত খাবারের ব্যবস্থা নেই। তিনি ভিক্ষাবৃত্তিও করেন না। ফলে অনেক সময় তাকে না খেয়েই দিন পার করতে হয় বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
এছাড়াও স্থানীয়দের ধারণা অনুযায়ী, তিনি পুরোপুরি মানসিক ভারসাম্যহীন নন। তবে তার অতীত পরিচয় সম্পর্কে খুব কম তথ্য পাওয়া গেছে। তার বাড়ি কোথায়, কিভাবে এখানে এসেছেন—এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি স্পষ্ট কোনো উত্তর দিতে পারেন না। অনেক প্রশ্ন করলেও খুব কম কথাই বলেন।
শহরের গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাশে এ ধরনের একটি মানবিক সংকট দীর্ঘদিন ধরে চললেও এখনো পর্যন্ত কোনো স্থায়ী পুনর্বাসন বা সহায়তার উদ্যোগ চোখে পড়েনি। বিষয়টি স্থানীয় সচেতন মহলে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের আইন অনুযায়ী, কোনো নারীকে যৌন হয়রানি বা নির্যাতন করা গুরুতর অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন, ২০০০ এবং বাংলাদেশ দণ্ডবিধি, ১৮৬০ অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। একইসাথে গৃহহীন ও ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় থাকা মানুষের পুনর্বাসন নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের মানবিক ও সামাজিক দায়িত্বের মধ্যেই পড়ে।
প্রশাসনের দৃষ্টি আকর্ষণ
গাইবান্ধার সচেতন নাগরিকদের পক্ষ থেকে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের প্রতি জরুরি দৃষ্টি দেওয়ার আহ্বান জানানো হচ্ছে। বিশেষ করে—
গাইবান্ধা সদর-২ আসনের মাননীয় সংসদ সদস্য
জেলা প্রশাসক (ডিসি), গাইবান্ধা
পুলিশ সুপার (এসপি), গাইবান্ধা
উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও), গাইবান্ধা সদর
সমাজসেবা অধিদপ্তর, গাইবান্ধা,
তাদের দ্রুত হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন স্থানীয়রা।
এছাড়া গাইবান্ধায় বৃহত ২ টি এনজিও সহায়তার হাত বাড়িয়ে দিতে পারেন। এবং সমাজের সবাই এ বিষয়টিকে গুরুত্বের সাথে নিলে অচিরেই হয়তো এর সমাধান মিলবে।
পরিস্থিতি বিবেচনায় নিম্নোক্ত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি বলে মনে করা হচ্ছে—
নিরাপদ আশ্রয়ের ব্যবস্থা করা
নিয়মিত খাবার ও চিকিৎসা সহায়তা প্রদান
সম্ভাব্য যৌন হয়রানির ঘটনার তদন্ত ও আইনি ব্যবস্থা
স্থায়ী পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা
পরিশেষে, জমিলা বেগম কেবল একজন গৃহহীন নারী নন; তিনি আমাদের সমাজের মানবিকতার একটি কঠিন পরীক্ষা। শহরের মাঝখানে বছরের পর বছর ধরে একজন নারী যদি এভাবে অবহেলা ও অনিরাপত্তার মধ্যে জীবনযাপন করেন, তবে তা নিঃসন্দেহে আমাদের সামষ্টিক দায়িত্বের প্রশ্ন তুলে দেয়।
এখন প্রয়োজন প্রশাসন, সমাজসেবী সংগঠন এবং সচেতন নাগরিকদের সম্মিলিত উদ্যোগ—যাতে অন্তত একটি জীবন নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদা ফিরে পায়।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply