
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্সিং বিভাগের সিন্ডিকেটের দুর্নীতি ও অনিয়ম: সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত, দুদকের একাধিক অভিযান
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল (খুমেক), যা দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সরকারি চিকিৎসা প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে চলছে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ। বিশেষ করে নার্সিং বিভাগে গড়ে ওঠা একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট হাসপাতালের সার্বিক ব্যবস্থাপনাকে নিয়ন্ত্রণ করে রেখেছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের কারণে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সেবা ব্যাহত হচ্ছে, এমনকি জীবনহানির ঘটনাও ঘটেছে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে, কিন্তু সমস্যা এখনো অমীমাংসিত রয়েছে।
নার্সিং সিন্ডিকেটের উত্থান ও অভিযোগের বিস্তারিত চিত্র
খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নার্সিং বিভাগে কর্মরত শতাধিক নার্সের মধ্যে একটি গ্রুপ গড়ে উঠেছে, যারা হাসপাতালের বিভিন্ন কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণ করে। এই সিন্ডিকেটের নেতৃত্বে রয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে রোকেয়া খাতুন (ডেপুটি নার্সিং সুপার, সুপারের চলতি দায়িত্বপ্রাপ্ত)। তার সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে হোসনেয়ারা খাতুন (প্রকল্পের ইনচার্জ), মমতাজ বেগম, মনজু ফলিয়া, সবুরা খাতুন, রনজু বৈরাগী, দুলালী জোয়ার্দার, রওশানারা, ফরিদা ইয়াসমিনসহ আরও কয়েকজন নার্স।
অভিযোগগুলোর মধ্যে রয়েছে:
প্রকল্পের টাকা নয় ছয়: সরকারি প্রকল্পের (যেমন কপার-টি বা অন্যান্য স্বাস্থ্য প্রকল্প) অর্থ আত্মসাৎ। নার্সদের জন্য বরাদ্দকৃত টাকা অনেকেই পান না।
রোস্টার বাণিজ্য:
ডিউটি রোস্টার নির্ধারণে ঘুষ নেওয়া, প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণের জন্য চাঁদা আদায়।
বেসরকারি নার্সদের ইন্টার্নশিপে ঘুষ: বেসরকারি নার্সদের ইন্টার্নশিপ প্রদানের নামে অর্থ গ্রহণ।
অধস্তনদের উপর চাপ: ইচ্ছামাফিক কৈফিয়ত তলব, বাধ্যতামূলক চাঁদা আদায়।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে ম্যানেজ: ভারপ্রাপ্ত পরিচালককে বিভিন্ন কৌশলে প্রভাবিত করে অপকর্ম চালিয়ে যাওয়া। নার্সিং বিভাগের অনিয়ম দেখার সরাসরি ক্ষমতা হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের না থাকায় তারা বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।
একটি সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, নার্সিং সেক্টরের এই সিন্ডিকেট হাসপাতালের পুরো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে। ফলে সাধারণ রোগীদের চিকিৎসা সেবা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। হাসপাতালের অবস্থা “হয়বরল” হয়ে পড়েছে বলে অভিহিত করা হয়েছে।
অক্সিজেন খুলে রোগীর মৃত্যু: এক মর্মান্তিক ঘটনা
সাম্প্রতিক সবচেয়ে আলোচিত ঘটনা হলো অক্সিজেন সিলিন্ডার খুলে নেওয়ার কারণে রোগীর মৃত্যু। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে খুমেক হাসপাতালের মেডিসিন ইউনিটে কিডনি রোগে আক্রান্ত শেখ সাইফুল ইসলাম (৩৮) ভর্তি হন। তার পরিবার কষ্ট করে অক্সিজেন সিলিন্ডার যোগাড় করে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বকশিশ (টাকা) না পাওয়ায় আউটসোর্সিং ক্লিনার (ওয়ার্ড বয়) অক্সিজেন মাস্ক খুলে নেন এবং অন্য রোগীকে দেন। কয়েক মিনিটের মধ্যেই রোগীর মৃত্যু হয়।
এ ঘটনায় দুদকের সমন্বিত খুলনা কার্যালয় অভিযান চালায়। অভিযানে বিভিন্ন অনিয়মের প্রমাণ মেলে। রোগীর স্বজনরা বলেন, “টাকা না দেওয়ায়” এমন ঘটনা ঘটেছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ তদন্তের আশ্বাস দিলেও অনেকে মনে করেন, এটি সিস্টেমিক দুর্নীতির ফসল।
দুদকের একাধিক অভিযান ও অন্যান্য অনিয়ম
দুদক খুমেক হাসপাতালে একাধিকবার অভিযান চালিয়েছে:
রান্নাঘর অভিযান (২০২৪ সালের ডিসেম্বর): রোগীদের খাবারে নিম্নমান ও পরিমাণে কম দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া যায়। আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়।
গণশুনানি (২০২৫ সালের মে): দালাল চক্র, রোগী ভাগিয়ে বেসরকারি ক্লিনিকে পাঠানো, নির্দিষ্ট ডায়াগনস্টিক সেন্টারে পরীক্ষা বাধ্য করা, শয্যা পাইয়ে অনিয়ম ইত্যাদি অভিযোগ উঠে। এক রোগীর স্বজন বলেন, সুইপার ড্রেসিং করে টাকা নিয়েছে।
অন্যান্য অভিযোগ: ডায়াগনস্টিক সেন্টারের দালালদের প্রতারণা, আউটসোর্সিং কর্মী নিয়োগে অনিয়ম, খাবারের নিম্নমান।
হাসপাতালের শয্যা সংখ্যা ৫০০ হলেও ভর্তি থাকে ১৫০০-এর বেশি রোগী। করিডোরে চিকিৎসা নিতে হয় অনেককে। এ সুযোগে দালাল সিন্ডিকেট সক্রিয়।
সিস্টেমিক সমস্যা ও সমাধানের দাবি
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নার্সিং বিভাগের সিন্ডিকেটের কারণে হাসপাতালের সার্বিক সেবা ব্যাহত হচ্ছে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ না থাকায় সমস্যা বাড়ছে। রোগী ও স্বজনরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন যে, “একজনও খুশি নয়” সেবা নিয়ে।
স্থানীয়রা দাবি করছেন:
দ্রুত তদন্ত ও অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা।
নার্সিং বিভাগে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা।
আউটসোর্সিং ও প্রকল্পের টাকায় স্বচ্ছতা।
দালাল চক্র দমন।
খুমেক হাসপাতাল দক্ষিণাঞ্চলের লাখো মানুষের ভরসাস্থল। কিন্তু দুর্নীতি ও সিন্ডিকেটের কারণে এর সুনাম ক্ষুণ্ন হচ্ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কঠোর হস্তক্ষেপ ছাড়া এ সমস্যা সমাধান হবে না বলে মনে করছেন সচেতন মহল।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply