1. admin@pratidindurnitirtalash.com : pratidindurnitirtalash : pratidindurnitirtalash
  2. zakirhosan68@gmail.com : zakirbd :
সোমবার, ২৯ জুন ২০২৬, ০৩:৩৬ পূর্বাহ্ন

সিলেটের সীমান্ত জনপদ মাদক ও অনলাইন জুয়ার দ্বিমুখী ছোবলে ক্ষতবিক্ষত

Reporter Name
  • Update Time : রবিবার, ২৮ জুন, ২০২৬
  • ২১ Time View

সিলেটের সীমান্ত জনপদ
মাদক ও অনলাইন জুয়ার দ্বিমুখী ছোবলে ক্ষতবিক্ষত

মোঃ আব্দুর রব : সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি

সিলেটের সীমান্তবর্তী কাঁটাতার গলে দেশে ঢুকছে সর্বনাশা মাদক। অন্যদিকে, হাতের স্মার্টফোনে চটকদার বিজ্ঞাপনের আড়ালে বসছে অনলাইন জুয়ার রমরমা আসর।

দুইয়ে মিলে জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলাগুলোতে চলছে এক নীরব ধ্বংসযজ্ঞ। মাদক আর অনলাইন জুয়ার এই দ্বিমুখী আক্রমণে জকিগঞ্জ, কানাইঘাট, কোম্পানীগঞ্জ, গোয়াইনঘাট ও জৈন্তাপুর উপজেলার প্রতিটি ইউনিয়নে যুবসমাজ এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।

শহর থেকে প্রত্যন্ত গ্রাম—সবখানেই এখন হাহাকার। কোথাও ইয়াবার টাকার ভাগাভাগি নিয়ে ঘটছে নির্মম খুন, কোথাও আবার জুয়ার টাকা জোগাড় করতে গিয়ে সন্তান হাত তুলছে মা-বাবার গায়ে, জড়িয়ে পড়ছে চুরি-ছিনতাইয়ের মতো অপরাধে।

অনুসন্ধানে জানা যায়, জৈন্তাপুর উপজেলার দীর্ঘ সীমান্তরেখা জুড়েই চলছে মাদকের পাইকারি ও খুচরা কারবার। উপজেলার ১২৭৮ নম্বর খাসিয়া হাওর ও শান্তিমাইর জুম থেকে শুরু করে যথাক্রমে ১২৭৯ মোকামপুঞ্জি, ১২৮০ শ্রীপুর, ১২৮১ ছাগল খাউরি, ১২৮২ মিনাটিলা, ১২৮৩ রাবার বাগান, লম্বাটিলা, ১২ রুটেশনাল ১২৮৪ কেন্দ্রী হাওর, ডিবির হাওর, ১২৮৫ ডিবির হাওর ফরিদের বাড়ি এলাকা, ১২৮৬ রিভার পিলার (ডিবির হাওর আসামপাড়া), ১২৮৬ ঘিলাতৈল, ১২৮৭ তলাল ও ফুলবাড়ী, ১২৮৮-১২৮৯ টিপরাখলা, ১২৯০ করিমটিলা ও কমলাবাড়ী, ১২৯১-১২৯২ ভেতরগোল, ১২৯৩-১২৯৫ গোয়াবাড়ী ও বাইরাখেল এবং ১২৯৬ হর্নি এলাকা দিয়ে দেদার প্রবেশ করছে ভারতীয় চোরাচালান পণ্য, ইয়াবা, মদসহ মাত্রাতিরিক্ত নেশাজাতীয় দ্রব্যাদি।

শুধু মাদকই নয়, জৈন্তাপুর সরকারি উচ্চবিদ্যালয় সংলগ্ন পুরাতন বিদ্যুৎ অফিস এলাকাটি এখন অনলাইন জুয়ার মূল ‘হটস্পট’।

অবৈধ ‘শিলং তীর’ খেলার জন্য এখানে ব্যবহৃত হচ্ছে উন্নত মোবাইল ডিভাইস, মুড়ি বই ও টোকেন।

এই মরণনেশায় নিঃস্ব হচ্ছে হাজারো সাধারণ মানুষ। স্থানীয় সূত্রের দাবি, কয়েস সুমী, জালাল বস্তির জেবু, জাহাঙ্গীরসহ একটি চক্র এই অনলাইন জুয়া ও তীর খেলার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করছে।

ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে গোয়াইনঘাট উপজেলাটিও মাদক ও অনলাইন জুয়ার অন্যতম আখড়ায় পরিণত হয়েছে।

পশ্চিম জাফলংয়ের হাজিপুর বাজার এখন মাদক, মানবপাচার ও চোরাকারবারীদের প্রধান আস্তানা।

হাজিপুরে চোরাচারানের সাথে কামাল আহমদ ওরফে কামাল মেম্বার, লুনি গ্রামের কামরুল ইসলাম, খায়রুল ইসলামের নাম উঠে এসেছে ।

এছাড়া মধ্য জাফলং, পূর্ব জাফলং (যেখানে মন্নান মেম্বার ও ডালিমের নাম বারবার উঠে এসেছে), বিছনাকান্দি (মূলহোতা লাইনম্যান নুরু ও গোলাম) এবং রুস্তুমপুর সীমান্ত দিয়ে অবাধে আসছে ভারতীয় মদ ও ইয়াবা।

সম্প্রতি গোয়াইনঘাট থানা পুলিশ জাফলংয়ের গুচ্ছগ্রাম এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৬০ বোতল ভারতীয় মদসহ কয়েকজন মাদক কারবারিকে আটক করলেও মূল হোতারা রয়ে গেছে ধরাছোঁয়ার বাইরে।

এছাড়া গতকাল ফতেপুর ইউনিয়ন থেকে এক মাদকাসক্তকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

একই সাথে গোয়াইনঘাটের ঘরে ঘরে ছড়িয়ে পড়েছে অনলাইন জুয়া।

ওয়ানএক্সবেট (1xBet), মেলবেট বা বাবু৮৮-এর মতো জুয়ার সাইটগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপনে প্রলুব্ধ হয়ে স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীরা বিকাশ, নগদ বা রকেটের মাধ্যমে প্রতিদিন লাখ লাখ টাকা ওড়াচ্ছে।

জুয়ার এই টাকা জোগাড় করতে গিয়ে এলাকায় দিন দিন বাড়ছে পারিবারিক কলহ, চুরি ও ছিনতাই।

কোম্পানীগঞ্জের উৎমা ছড়া, বরম সিদ্দিপুর, কালাইরাগ ও ছনবাড়ী সীমান্ত দিয়ে ওরিও বিস্কুট, জিরা বা চিনির মতো খাদ্যদ্রব্যের আড়ালে মূলত ঢুকছে ইয়াবা ও মদ।

স্থানীয় সূত্রের দাবি, খাদ্যদ্রব্যের নামে পুলিশের কাছ থেকে ‘লাইন’ বা অলিখিত অনুমতি নেওয়া হয়।

সীমান্ত দিয়ে মাদক নামার পর টুকের বাজার, পাড়ুয়া, বর্নি, গৌরিনগর ও খাগাইল এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে নিয়মিত মাদকের হাট বসছে।

সন্ধ্যা নামার সাথে সাথেই শহর থেকে আসা মাদকসেবীদের আড্ডায় মুখর হয়ে ওঠে মহাসড়ক সংলগ্ন এলাকাগুলো।

পাশাপাশি কোম্পানীগঞ্জের ইসলামপুরসহ বিভিন্ন ইউনিয়নে অনলাইন জুয়া মহামারী আকার ধারণ করেছে।

সহজ উপায়ে রাতারাতি ধনী হওয়ার লোভে তরুণরা বন্ধুদের কাছ থেকে বা চড়া সুদে ঋণ নিয়ে জুয়া খেলছে, পরে সর্বস্ব হারিয়ে ঋণের জালে জর্জরিত হচ্ছে।

পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশ ও র‍্যাব প্রায়ই অভিযান চালাচ্ছে। সম্প্রতি কোম্পানীগঞ্জে মাত্র ২ দিনের অভিযানে ২৫ জন জুয়াড়িকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তবে স্থানীয়রা বলছেন, কেবল সাময়িক অভিযানে এই ধ্বংসাত্মক প্রবণতা রুখে দেওয়া সম্ভব নয়।

মাদকের ভয়াবহতা কানাইঘাটে কতটা নৃশংস রূপ নিয়েছে, তার প্রমাণ মিলেছে গত ১ ডিসেম্বর (সোমবার)। ভারত থেকে চোরাই পথে আনা ইয়াবা বিক্রির মাত্র ২ লক্ষ টাকার ভাগ-বাটোয়ারা নিয়ে কানাইঘাটের সীমান্তবর্তী লক্ষ্মীপ্রসাদ পূর্ব ইউনিয়নের রাতাছড়া গ্রামে ছয়ফুল ইসলাম (১৯) নামের এক তরুণকে খুঁটিতে বেঁধে কুপিয়ে হত্যা করা হয়েছে।

এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের পর বিক্ষুব্ধ স্বজনরা অভিযুক্ত শাকিল আহমদের বাড়িঘর ভাঙচুর করে এবং শাকিলের পিতা আব্দুল হান্নান হানাইকে আটকে পুলিশের হাতে তুলে দেয়।

খুনের পাশাপাশি কানাইঘাটের প্রত্যন্ত অঞ্চলেও ফ্রি-ফায়ার, পাবজি, লুডু, ক্যারাম এবং বিভিন্ন ক্যাসিনো অ্যাপের আড়ালে জুয়া খেলে নিঃস্ব হচ্ছে শিক্ষার্থীরা।

এই অনলাইন জুয়ার আসক্তি পরবর্তীতে তাদের ঠেলে দিচ্ছে মাদক সেবনের অন্ধকার পথে।

ভারতের আসাম রাজ্য সংলগ্ন জকিগঞ্জ উপজেলাটি মাদক কারবারিদের কাছে অন্যতম ‘নিরাপদ রুট’ হিসেবে পরিচিত।

চোরাকারবারিরা কুশিয়ারা নদীপথ এবং কাঁটাতারের বেড়া গলিয়ে নিয়ে আসছে ইয়াবার বড় বড় চালান।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর চোখ ফাঁকি দিতে মাদক ব্যবসায়ীরা ইয়াবাকে ‘বিচি’, ‘বোতাম’ বা ‘মাল’ নামে ডাকছে।

ইয়াবার পাশাপাশি অবাধে ঢুকছে ফেনসিডিল, বিদেশি মদ ও গাঁজা। স্মার্টফোনের সহজলভ্যতায় এই উপজেলার তরুণ সমাজও এখন অনলাইন বেটিং ও জুয়ার ফাঁদে পড়ে অপরাধ জগতের দিকে ধাবিত হচ্ছে।

স্থানীয় সমাজকর্মীদের মতে, সীমান্তজুড়ে বিস্তৃত এই মাদক ও জুয়ার সিন্ডিকেট এখনই উপড়ে ফেলতে না পারলে পুরো সিলেটের যুবসমাজ পঙ্গু হয়ে যাবে।

এর জন্য প্রয়োজন ব্যাপক পারিবারিক সচেতনতা, আর্থিক লেনদেনের (বিকাশ/নগদ) ওপর কঠোর নজরদারি এবং তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদন ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি করা।

অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম) জাকির হোসেন জানান, ‘সীমান্ত অঞ্চলের মাদক ও জুয়ার বিরুদ্ধে জেলা পুলিশের বিশেষ অভিযান নিয়মিত অব্যাহত রয়েছে।

এসব অপরাধ দমনে পুলিশ প্রশাসন অত্যন্ত কঠোর এবং কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডকে প্রশ্রয় না দিয়ে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বজায় রেখে কাজ করে যাচ্ছে।

র‍্যাব-৯ এর মিডিয়া অফিসার এএসপি কে. এম. শরিফুল ইসলাম সোহাগ জানান, ‘সীমান্ত দিয়ে মাদক বন্ধে র‍্যাবের বিশেষ অভিযান ও গোয়েন্দা নজরদারি নিয়মিত চলছে।

সম্প্রতি কোম্পানীগঞ্জ ও জকিগঞ্জ সীমান্ত এলাকা থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ লিকুইড মদ উদ্ধার করা হয়েছে। এ ছাড়া, মহানগরের কোতোয়ালীসহ বিভিন্ন স্থানে অভিযান পরিচালনা করে অনলাইন জুয়ার সাথে জড়িত বেশ কিছু অপরাধীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

এই ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে র‍্যাব সম্পূর্ণ আপসহীন ও কঠোর অবস্থানে রয়েছে এবং তথ্য পাওয়ামাত্রই দ্রুত অভিযান চালানো হচ্ছে।

সিলেটের পুলিশ সুপার ড. চৌধুরী মো. যাবের সাদেক জানান, ‘মাদকের বর্তমান ভয়াবহতা সমাজে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে এবং এটি অস্বীকার করার কোনো উপায় নেই। এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে প্রতিনিয়ত বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে এবং নিয়মিত মাদক উদ্ধারসহ মামলা দায়ের করা হচ্ছে।

অনলাইন জুয়া প্রসঙ্গে এই অপরাধ নিয়ন্ত্রণে জাতীয় সংসদে নতুন আইন পাস হতে যাচ্ছে।
মাদক ও জুয়ার মতো অপরাধ পুরোপুরি নির্মূল করতে পুলিশের অভিযানের পাশাপাশি সুশীল সমাজ ও সাধারণ মানুষের অংশগ্রহণ এবং একটি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি।’

এ বিষয়ে সিলেট ব্যাটালিয়নের ৪৮ বিজিবি অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. নাজমুল হকের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

Please Share This Post in Your Social Media

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

More News Of This Category

© All rights reserved © 2025

: :