
গোবিন্দগঞ্জে অন্ধ বৃদ্ধার দায়িত্ব নিলেন অপরাজিতা ফাউন্ডেশন
গাইবান্ধা প্রতিনিধি
গাইবান্ধার গোবিন্দগঞ্জ পৌরসভার পূর্ব পান্থাপাড়া এলাকার বাসিন্দা প্রয়াত মোসলেম উদ্দিনের স্ত্রী বিধবা আজিদা বেগম। স্বামীর মৃত্যুর পর দুই সন্তানকে নিয়ে ৩৫ বছর ধরে তাঁর জীবন কাটান অভাব আর অনিশ্চয়তার মধ্যে। অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে, আবার কখনো প্রতিবেশীদের কাছে হাত পেতে খুব কষ্টে ছেলেমেয়েকে বড় করেন। একসময় তাদের বিয়ে হয়ে গেলে তিনি একাই জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ একটি ঘরে থাকতেন। সামান্য বৃষ্টি হলে সেই ঘরের চাল দিয়ে পানি পড়ত। দীর্ঘ জীবনে দারিদ্রতা ছিল তার নিত্যদিনের সঙ্গী। ৬ বছর আগে কোভিড মহামারীর মধ্যে তিনি ধীরে ধীরে চোখের দৃষ্টি হারান। অভাবের সংসারে টাকা জোগাড় করে আর চিকিৎসকের কাছে যেতে পারেননি। অসহায় এই মায়ের দুঃখ-দুর্দশা দেখেও সমাজের অনেক বিত্তবান মানুষ ছিলেন নীরব।
এমন সময় তার জীবনে আশার আলো হয়ে আসে অপরাজিতা ফাউন্ডেশন। অসহায় এই বিধবা মায়ের দুর্দশার কথা জানতে পেরে সংগঠনটির সদস্যরা। প্রথমে তারা চেষ্টা করে বৃদ্ধ মায়ের চোখের দৃষ্টি ফিরিয়ে আনার। কিন্তু ভাগ্যের নির্মম পরিহাস দুই দফা ঢাকায় নিয়ে গিয়ে ডাক্তার দেখালেও চোখের দৃষ্টি আর ফেরানো সম্ভব হয়নি। পরীক্ষা করে দেখা গেছে দীর্ঘদিন ধরে চিকিৎসার অভাবে তাঁর চোখের নার্ভগুলো স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমতাবস্থায় অপরাজিতা ফাউন্ডেশন নতুন করে স্বাবলম্বী প্রজেক্ট আওতায় তাঁর ঘর সংস্কারের উদ্যোগ নেন এবং আজীবন এই অসহায় মায়ের ভরণপোষণের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ভালোবাসা, মানবতা ও সহমর্মিতার এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করে তারা আজিদা বেগমের মাথার ওপর একটি নিরাপদ আশ্রয় গড়ার পাশাপাশি জীবনের শেষদিন পর্যন্ত তাঁর সংসারের সকল খরচের দ্বায়িত্বভার গ্রহণ করেন।
রবিবার (২৮ জুন) সকাল ১০টায় ঘরের সংস্কার কাজ শেষে আগামী এক মাসের বাজার নিয়ে অপরাজিতা ফাউন্ডেশনের সদস্যরা সেখানে হাজির হলে আজিদা বেগমের মুখে ফুটে ওঠে আনন্দ। বহুদিনের কষ্টের জীবন পেরিয়ে নিজের একটি নিরাপদ আশ্রয় ও ভরণপোষণ পেয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন।
বৃদ্ধা আজিদা বেগম আবেগাপ্লুত কন্ঠে বলেন, আজে মেয়ে দেখাশুন করে, ছেলেও দেয়। অভাবী সংসারের মধ্যে হানি দেয়। হামার তো একন চোখ কানা বাবা। হামি তো থিত পাইনা। মাথার কামড়, চোখের কামড়ে তো ঠিক থাকপার পাইনা। তখন আমার ওষুধ লাগে। অস্থিরের মধ্যে পড়ে যাই। এখন ডাক্তার বলল হবা না, চোখের মেইন রগটাই নষ্ট হয়ে গেছে। হামাক এতকিছু দিছে, যেতদিন বাঁচে আছি। এইভাবে হামায় আল্লাহ যদি নেয়ে যায়। তাঁরও ছোলপোল যেন সুখে শান্তিতে দিন যায়। কনো যেনো ইয়া হয় না, কষ্ট হয় না। কোনো যেনো বিপদত পড়ে না। আল্লাহর কাছে হামি সকসময় কই বাবা।
আজিদা বেগমের মেয়ে মোরশেদা বেগম বলেন, শাড়ি, চাদর, ডিম, লাউ আলু, চাউল, ময়মশলা, মাছ, তেল, কালাই মানে কাঁচা বাজার যা লাগে তাই দিছে। আমরা ছেলেমেয়ে যা করতে পারছি আপনারা তাই করছেন। আমরা আল্লাহর কাছে দোয়া করি তাঁর ছেলেমেয়েরা সুখে শান্তিত থাক। আমার অন্ধ মায়ের পাশে যারা দাঁড়াছে তাদের ছেলেমেয়ে সুখে শান্তিতে থাক। অপরাজিতা ফাউন্ডেশন থেকে ঘরের মেরামত করে দিসে, থাকার মত আশ্রয় করে দিছে।
স্থানীয় বাসিন্দা আবু আল ইমরান তালুকদার বলেন, অপরাজিতা ফাউন্ডেশন আমাদের এই গোবিন্দগঞ্জে বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। এর মধ্যে কম্বল বিতরণ, হুইল চেয়ার বিতরণ, আশ্রয়হীদের জন্য গৃহ নির্মাণ অন্যতম। তারই অংশ হিসেবে আমার গ্রামে দুস্থ ও অসহায় আজেদা বেগমের জন্য অপরাজিতা ফাউন্ডেশন চেষ্টা করে তাঁর চোখ দুটো ভালো করার ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য। এ কারনে ঢাকায় ইসলামিয়া চক্ষু হাসপাতালে তাকে দুই বার পাঠায়। অনেক চেষ্টা করেও যখন তাঁর চোখ কোনোভাবেই ভালো করা সম্ভব হলো না, সে যেন সুস্থ স্বাভাবিকভাবে থাকতে পারে তাই টিন, বাঁশ, কাঠ দিয়ে বৃদ্ধার ঘর ভালো করে করে দেয়। তারপর তার সারাজীবনের খাওয়া-পড়ার দায়িত্ব নিয়েছে অপরাজিতা ফাউন্ডেশন ।
অপর এক বাসিন্দা আইয়ুব হোসেন বলেন, আজকে এই অসহায় মহিলার পাশে অপরাজিতা ফাউন্ডেশন দাঁড়িয়েছে। আমি তাদের আন্তরিকভাবে ধন্যবাদ জানাই। আগামীতে তারা যেন আরও সুন্দরভাবে এই কর্মকান্ডগুলো চালিয়ে যায়। আমরা তাদের পাশে থাকার চেষ্টা করবো। পান্থাপাড়া বাসীর পক্ষ থেকে তাদের ধন্যবাদ।
অপরাজিতা ফাউন্ডেশনের প্রতিনিধি দাউদ হাসান চৌধুরী সুমন বলেন, একদিন এই পথে যাওয়ার সময় উনাকে বাহিরে বসে থাকতে দেখি। তখন জানতে পারি চোখে সমস্যার কারনে উনি দেখতে পান না। চোখের চিকিৎসার জন্য চেষ্টা করি কিন্তু দুই বার ঢাকায় পাঠালেও আর চোখ ঠিক হয়নি। যেহেতু উনার চোখ ঠিক হলো না সেক্ষেত্রে অন্যভাবে সহযোগীতা করার লক্ষ্যে কমিটির সদস্যদের সাথে আলোচনা করে উনাকে আজীবন তিন বেলা খাওয়া পড়ার ব্যবস্থা করি। অপরাজিতা ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে এই ব্যবস্থা চলতে থাকবে, ইনশা’আল্লাহ।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply