
গতকাল এসএসসি পরীক্ষা এবং বর্তমান অবস্হা নিয়ে কথা বলার পর অনেকেই ব্যক্তিগতভাবে আক্রমণ করছেন, দলীয় ট্যাগ লাগানোর চেষ্টা করছেন। তাদের উদ্দেশ্যে শুরুতেই একটা কথা পরিষ্কার জানিয়ে দিতে চাই—আমি কোনো রাজনৈতিক দলের অন্ধ সমর্থক নই।আমার একমাত্র দল ‘বাংলাদেশ’, আর আমার একমাত্র স্বার্থ ‘আমার দেশের ছাত্র-ছাত্রী ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম’।
একটি জাতির মেরুদণ্ড হলো তার শিক্ষা ব্যবস্থা। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি কোনোদিন টেকসই উন্নতি করতে পারে না। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, গত কয়েক বছরে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার যে চরম ধস নেমেছে, একজন শিক্ষক হিসেবে সেটা আমি খুব কাছ থেকে দেখেছি।
অপ্রিয় হলেও সত্যি, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে অনেক উন্নয়নমূলক কাজ হলেও, সবচেয়ে বড় ক্ষতিটা হয়েছে আমাদের শিক্ষা খাতে। নামে মাত্র পড়াশোনা, পরীক্ষার আগে প্রশ্ন ফাঁসের মহোৎসব কিংবা না পড়েই ঢালাও জিপিএ-৫ পাওয়ার যে সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল, তা আমাদের শিক্ষার্থীদের পঙ্গু করে দিয়েছে। দিন-রাত এক করে পড়াশোনা করার পরও আমাদের সময়ে যা কল্পনা করা যেত না, গত কয়েক বছর ধরে তা-ই নিয়মে পরিণত হয়েছে। পড়াশোনা ছাড়াই সবাই পাস, সবাই জিপিএ-৫! কিন্তু এই জিপিএ-৫ পাওয়া শিক্ষার্থীদের অনেকের ভেতরেই প্রকৃত কোনো জ্ঞান নেই।
আজ আমাদের অধঃপতন কতটা নিম্ন পর্যায়ে পৌঁছেছে তা বর্তমান প্রজন্মের দিকে তাকালেই বোঝা যায়। তারা দেশের প্রধানমন্ত্রীর নাম জানে না, শিক্ষামন্ত্রীর নাম জানে না। আর যদি কেউ জানেও, দেশের সর্বোচ্চ সম্মানীয় ব্যক্তিদের নিয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তারা ব্যঙ্গ-বিদ্রূপ করে, ট্রল করে। একজন মান্যবর ব্যক্তিকে নাম ধরে ডেকে তামাশা করার এই যে অপসংস্কৃতি, এটা কোনো সভ্য শিক্ষিত সমাজের লক্ষণ হতে পারে না। এই চরম নৈতিক অবক্ষয় আর মূর্খতা প্রমাণ করে—আমাদের শিক্ষার্থীরা সার্টিফিকেট পাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু প্রকৃত ‘শিক্ষা’ পাচ্ছে না।
এই জগাখিচুড়ি অবস্থা থেকে আমরা বের হতে চাই। বর্তমান শিক্ষামন্ত্রী হয়তো দীর্ঘদিন এই সেক্টরে ছিলেন না, তাঁর সময়কাল ও বর্তমান সময় ভিন্ন। তিনি নতুন কিছু পদক্ষেপ নিচ্ছেন—তার কিছু হয়তো ভালো হবে, কিছু হয়তো চ্যালেঞ্জিং হবে। কিন্তু আমি চাই, শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যতের জন্য যা কল্যাণকর, তা যত কঠিন পদক্ষেপই হোক না কেন, সেটাই বহাল থাকুক।
বর্তমান প্রজন্ম যদি বুক ফুলিয়ে গর্ব করে বলতে পারে যে, তারা আন্দোলন করে একটি ফ্যাসিবাদের পতন ঘটিয়েছে, শেখ হাসিনাকে বিদায় করেছে—তাহলে তাদের এই গর্বও করতে শিখতে হবে যে, প্রয়োজনে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে, ‘সাঁতরে’ হলেও তারা নিজেদের শিক্ষা ব্যবস্থার সংস্কার এনেছে।
শিক্ষকতা পেশায় থেকে গত কয়েক বছর ধরে শিক্ষার্থীদের আচরণ এবং পড়াশোনার যে বেহাল দশা দেখেছি, তা থেকে মন থেকে চাই—আগামী প্রজন্ম যেন এই অন্ধকারের মধ্য দিয়ে না যায়। এই সত্য কথাগুলো বলার অপরাধে যদি আমাকে শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে আর নাও নেওয়া হয়, তবুও আমি বুক ফুলিয়ে এই কথাই বলে যাব। কারণ ব্যক্তিস্বার্থের চেয়ে দেশের ভবিষ্যৎ কোটি শিক্ষার্থীর স্বার্থ অনেক বড়।
শিক্ষা ব্যবস্থার এই মুহূর্তেই আমূল পরিবর্তন প্রয়োজন। মেধার মূল্যায়ন হোক, সার্টিফিকেট সর্বস্ব ফাঁপা শিক্ষার অবসান ঘটুক। আমরা আমাদের সন্তানদের প্রকৃত শিক্ষিত এবং মর্যদাসম্পন্ন মানুষ হিসেবে দেখতে চাই।
✍️✍️Shishir Bindu
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply