
গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (GUK)-এর বিরুদ্ধে কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ:
কর্মচারীদের পাওনা বঞ্চনা, আমানত আত্মসাৎ, ভুয়া অডিট ও ঋণের অর্থ অপব্যবহারের অভিযোগে তদন্ত দাবি
গাইবান্ধা প্রতিনিধি:
উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বৃহৎ বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (GUK)-এর বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে আর্থিক অনিয়ম, কর্মচারীদের পাওনা আত্মসাৎ, সদস্যদের বিমা ও আমানতের অর্থে দুর্নীতি, ভুয়া অডিট রিপোর্ট, ঋণের অর্থ অপব্যবহার এবং ক্ষমতার অপব্যবহারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী সাবেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো বলছে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা হলে কোটি কোটি টাকার অনিয়ম ও দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে।
অভিযোগ অনুযায়ী, চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া বা চাকরি ছাড়ার পর বহু কর্মচারীর চূড়ান্ত পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। পাওনা দাবি করলে বিভিন্নভাবে হয়রানি করা হয় এবং অনেক ক্ষেত্রে ভিত্তিহীন অভিযোগ গঠন করে কর্মচারীদের চাপে রাখা হয়।
এছাড়া সদস্যদের কাছ থেকে বিমা বাবদ আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ নিয়মিত আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতি হাজার টাকায় ১০ টাকা আদায় করা হলেও হিসাবভুক্ত করা হয়েছে মাত্র ৫ টাকা, বাকি অর্থ আত্মসাৎ করা হয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যাংক হিসাবের লেনদেন তদন্ত করলে এর সত্যতা বেরিয়ে আসবে বলে দাবি করা হয়েছে।
অভিযোগে আরও বলা হয়েছে, সদস্যদের মাঝে ঋণ বিতরণের জন্য বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নেওয়া বিপুল অঙ্কের ঋণের অর্থ নির্ধারিত খাতে ব্যবহার না করে ফ্ল্যাট ক্রয়সহ অন্যান্য খাতে ব্যয় করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব অর্থের একটি অংশ কোথাও সঠিকভাবে হিসাবভুক্ত করা হয়নি। বিভিন্ন ব্যাংকের হিসাব ও লেনদেনের নথিপত্র পর্যালোচনা করলে প্রকৃত তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে বলে অভিযোগকারীরা দাবি করেছেন।
কর্মচারীদের জামানত, প্রভিডেন্ট ফান্ড (PF) এবং অন্যান্য সঞ্চয়ের অর্থ ব্যবহার করে প্রতিষ্ঠানটির জন্য গাড়ি ক্রয়ের অভিযোগও রয়েছে। ভুক্তভোগীদের দাবি, বর্তমানে সংশ্লিষ্ট তহবিলে অর্থের ঘাটতি রয়েছে এবং অনেক কর্মচারী তাদের ন্যায্য পাওনা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন।
২০১৬ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানের অডিট রিপোর্ট নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগকারীদের ভাষ্য, অডিট রিপোর্টে প্রদর্শিত ব্যাংক ব্যালেন্স ও ঋণের হিসাবের সঙ্গে প্রকৃত ব্যাংক স্টেটমেন্টের ব্যাপক অমিল রয়েছে। ফলে অডিট রিপোর্টের গ্রহণযোগ্যতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ সৃষ্টি হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, অনুমোদন ছাড়াই মাসিক ডিপোজিট, মাসিক মুনাফা ও দ্বিগুণ মুনাফাভিত্তিক বিভিন্ন সঞ্চয় প্রকল্প পরিচালনা করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের মাধ্যমে সংগৃহীত অর্থের প্রকৃত অবস্থান ও ব্যবহারের বিষয়ে কোনো স্বচ্ছতা নেই বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে।
এছাড়া চাকরিতে নিয়োগের সময় কর্মচারীদের কাছ থেকে নগদ জামানত, শিক্ষাগত সনদের মূল কপি, স্বাক্ষরযুক্ত ফাঁকা চেক এবং স্ট্যাম্পে অঙ্গীকারনামা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। চাকরি শেষে পাওনা দাবি বা কোনো কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ করলে ওই ফাঁকা চেক ব্যবহার করে মামলা করার ভয় দেখানো হতো বলে অভিযোগ করেছেন একাধিক সাবেক কর্মচারী।
এদিকে, সাবেক হিসাব কর্মকর্তা মোঃ মেসবাহুল ইসলাম ২০২১ সালের ২৮ নভেম্বর মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA)-এর কাছে লিখিত অভিযোগে উল্লেখ করেন যে, ২০১৫ সালের ১ মার্চ থেকে ২০২০ সালের ৩১ জুলাই পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করলেও চাকরি থেকে অব্যাহতির পর তার চূড়ান্ত পাওনা পরিশোধ করা হয়নি। বারবার যোগাযোগের পরও তিনি তার পাওনা বুঝে পাননি বলে অভিযোগে উল্লেখ করেন।
অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে নির্বাহী প্রধান
গণ উন্নয়ন কেন্দ্র (GUK)-এর নির্বাহী প্রধান এম. আবদুস সালাম-এর বিরুদ্ধেও গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, দীর্ঘদিন ধরে প্রতিষ্ঠানের আর্থিক কার্যক্রম নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন, যার উৎস তদন্তের দাবি রাখে।
অভিযোগ রয়েছে, তিনি গাইবান্ধা জেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন। ভুক্তভোগীদের দাবি, এই পদমর্যাদা ও প্রভাবের কারণে অনেকেই তার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলতে সাহস পান না। ফলে প্রতিষ্ঠানের অভ্যন্তরে অনিয়ম, দুর্নীতি ও আর্থিক অসঙ্গতির অভিযোগ থাকলেও দীর্ঘদিন ধরে কার্যকর তদন্ত হয়নি।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, দুর্নীতি প্রতিরোধের দায়িত্বে থাকা কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে যখন আর্থিক অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তখন বিষয়টি আরও গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক, ভুক্তভোগী কর্মচারী এবং সুশাসনকর্মীদের দাবি, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), মাইক্রোক্রেডিট রেগুলেটরি অথরিটি (MRA), বাংলাদেশ ব্যাংকের আর্থিক গোয়েন্দা ইউনিট (BFIU) এবং সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থার মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানের ব্যাংক হিসাব, অডিট রিপোর্ট, সম্পদ অর্জনের উৎস, কর্মচারীদের পাওনা এবং সদস্যদের আমানতের অর্থের পূর্ণাঙ্গ ফরেনসিক অডিট করা হোক।
তাদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে এটি শুধু একটি প্রতিষ্ঠানের অনিয়ম নয়; বরং হাজার হাজার সদস্য, কর্মচারী ও আমানতকারীর স্বার্থের সঙ্গে জড়িত একটি বড় আর্থিক কেলেঙ্কারি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply