
সাভারে ফুটপাত ও মহাসড়ক দখল করে দোকানের সংখ্যা বাড়ছেই, চরম ভোগান্তিতে পথচারী ও যাত্রীরা
মোঃ আব্দুর রব : নিজস্ব প্রতিবেদক
ঢাকার পার্শ্ববর্তী শিল্পাঞ্চল সাভার-এ দিন দিন ফুটপাত ও মহাসড়ক দখল করে গড়ে উঠছে অসংখ্য অস্থায়ী ও ভাসমান দোকান।
বিশেষ করে ঢাকা-আরিচা মহাসড়ক ও নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়ক-এর বিভিন্ন পয়েন্টে ফুটপাত ও সড়কের একাংশ দখল করে বসানো হয়েছে চা-স্টল, ফলের দোকান, মোবাইল এক্সেসরিজ, পোশাক ও খাবারের অস্থায়ী স্টল। এতে একদিকে যেমন যানজট বাড়ছে, অন্যদিকে পথচারীদের চলাচল হয়ে পড়েছে ঝুঁকিপূর্ণ। এদিকে সাভার বাজার বাস স্ট্যান্ড এর দুই পাশের পুরো ফুটপাথ ও মহাসড়কের বেশিরভাগ অংশ জুড়ে শত শত দোকান বসিয়ে চলছে বেচাকেনা।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরেই সড়কের পাশে দোকান বসানো হলেও সম্প্রতি এর সংখ্যা আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত এসব দোকান ঘিরে তৈরি হয় ভিড়, যার ফলে যানবাহন চলাচলে বিঘ্ন ঘটে এবং প্রায়ই ছোটখাটো দুর্ঘটনা ঘটছে।
সাভার বাজার রোডের বাসিন্দা আবদুল করিম বলেন, “আমরা প্রতিদিন অফিসে যেতে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হচ্ছি। মহাসড়কের অর্ধেক জায়গা দোকানদাররা দখল করে রেখেছে। বাস-ট্রাক পাশ কাটাতে গিয়ে মাঝেমধ্যে পথচারীদের গা ঘেঁষে চলে যায়। যেকোনো সময় বড় দুর্ঘটনা ঘটতে পারে।”
একই অভিযোগ করেন কলেজছাত্রী নুসরাত জাহান। তিনি বলেন, “ফুটপাত দিয়ে হাঁটার কোনো সুযোগ নেই। বাধ্য হয়ে সড়কেই হাঁটতে হয়। এতে প্রতিনিয়ত দুর্ঘটনার ভয় থাকে। বিশেষ করে সন্ধ্যার পর পরিস্থিতি আরও খারাপ হয়ে যায়।”
পরিবহন চালকরাও পড়েছেন বিপাকে। মিনিবাস চালক সোহেল রানা জানান, “রাস্তার পাশে যত্রতত্র দোকান বসায় গাড়ি ঠিকমতো চালানো যায় না। যাত্রী ওঠানামার সময়ও সমস্যা হয়। একটু অসাবধান হলেই দুর্ঘটনা।”
এদিকে দোকানদারদের দাবি, জীবিকার তাগিদেই তারা মহাসড়কের পাশে বসেছেন। ফল বিক্রেতা রফিকুল ইসলাম বলেন, “আমরা কেউ শখ করে এখানে বসিনি। সংসার চালাতে হয় বলেই বসেছি। বিক্রি ভালো হয় বলে এই জায়গা ছাড়তে পারি না। তবে প্রশাসন যদি বিকল্প জায়গা দেয়, আমরা সরে যেতে রাজি।”
স্থানীয় ব্যবসায়ী সমিতির এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “অনেক সময় অভিযান চালিয়ে দোকান উচ্ছেদ করা হয়। কিন্তু কয়েকদিন পর আবার তারা বসে পড়ে। স্থায়ী সমাধানের জন্য পরিকল্পিত বাজার বা নির্দিষ্ট হকার জোন দরকার।”
সড়ক দখলের কারণে শুধু যানজট নয়, জরুরি সেবাও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। স্থানীয় এক ওষুধ ব্যবসায়ী জানান, সম্প্রতি এক অসুস্থ ব্যক্তিকে হাসপাতালে নিতে গিয়ে অ্যাম্বুলেন্স দীর্ঘ সময় যানজটে আটকে ছিল। “রাস্তা যদি দখলমুক্ত থাকত, হয়তো দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া যেত,” বলেন তিনি।
ট্রাফিক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান চালাই। কিন্তু হকাররা আবার ফিরে আসে। বিষয়টি সমন্বিতভাবে সমাধান করতে হবে—প্রশাসন, পৌরসভা ও ব্যবসায়ী সংগঠনকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে।”
শহর পরিকল্পনাবিদদের মতে, দ্রুত নগরায়নের ফলে সাভারে জনসংখ্যা ও বাণিজ্যিক কার্যক্রম বেড়েছে, কিন্তু সেই অনুপাতে অবকাঠামোগত উন্নয়ন হয়নি। ফলে মহাসড়কের পাশই হয়ে উঠছে অনিয়ন্ত্রিত ব্যবসার কেন্দ্র। তারা বলছেন, বিকল্প বাজার, নির্দিষ্ট হকার জোন ও কঠোর নজরদারি ছাড়া এই সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়।
এদিকে সাধারণ মানুষ চান দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ। স্থানীয় শিক্ষক মাহবুব আলম বলেন, “উন্নয়নের নামে যদি সড়কই দখল হয়ে যায়, তাহলে সাধারণ মানুষ চলবে কীভাবে? প্রশাসনের উচিত দ্রুত দখলমুক্ত করে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা।”
সংশ্লিষ্টদের মতে, একদিকে জীবিকার প্রশ্ন, অন্যদিকে জনদুর্ভোগ—এই দুইয়ের মধ্যে সমন্বয় করেই সমাধান খুঁজতে হবে। নইলে সাভারের মহাসড়কগুলোতে যানজট, দুর্ঘটনা ও ভোগান্তি দিন দিন আরও বাড়তেই থাকবে।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply