
সিলেট রেলওয়ে স্টেশনে কু*ড়ি*য়ে পাওয়া সেই ‘স্বপ্না’র রাজকীয় বিয়ে
মোঃ আব্দুর রব : সিলেট বিভাগীয় প্রতিনিধি
চার বছর বয়সে সিলেট রেলওয়ে স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে পরিত্যক্ত অবস্থায় পাওয়া গিয়েছিল তাকে। নিজের নামটুকুও বলতে না পারা সেই ছোট্ট শিশুটির আজ ঠাঁই হয়েছে নতুন ঠিকানায়।
দীর্ঘ ১৪ বছরের অনিশ্চয়তা আর লড়াই শেষে বুধবার ১৩ মে এক আবেগঘন পরিবেশে বিয়ের পিঁড়িতে বসেন সেই স্বপ্না আক্তার।
সরকারি প্রতিষ্ঠান ও সমাজের সাধারণ মানুষের ভালোবাসায় পরিবারহীন এক তরুণীর নতুন জীবনের সূচনার এই ঘটনা সিলেটে এক অনন্য মানবিক দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে।
সিলেটের শিবগঞ্জ লামাপাড়ায় সমাজসেবা অধিদপ্তরের অধীনে পরিচালিত সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্রে এই বিয়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়।
যে প্রতিষ্ঠান তাকে পরম মমতায় বড় করে তুলেছে, তারাই আজ অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে তাকে বিদায় জানালো।
সমাজসেবা অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে চার বছর বয়সে স্বপ্নাকে অসহায় অবস্থায় সিলেট রেলওয়ে স্টেশন থেকে উদ্ধার করা হয়।
পরে জানা যায় তার বাবা-মা দুজনেই মারা গেছেন। এরপর থেকেই সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র হয় তার আপন ঘর।
সেখানে বড় হওয়ার পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যান তিনি এবং ২০২৫ সালে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন।
বর্তমানে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ায় স্বপ্নার সম্মতি ও ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে এই বিয়ের আয়োজন করা হয়।
বর সিলেটেরই সন্তান এবং পেশায় একজন ইলেকট্রিক ঠিকাদার।
বিয়ের পুরো আয়োজন ছিল একটি স্বাভাবিক মধ্যবিত্ত পরিবারের অনুষ্ঠানের মতোই জমকালো।
সাজসজ্জা থেকে শুরু করে আপ্যায়ন—কোনো কিছুতেই ঘাটতি ছিল না।
স্বপ্নার উজ্জ্বল ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে সমাজের বিভিন্ন স্তরের মানুষ ও প্রতিষ্ঠান এগিয়ে এসেছে।
তার নামে প্রায় দুই লাখ টাকার এফডিআর করে দেওয়া হয়েছে এবং স্থানীয় একজন দানশীল ব্যক্তি উপহার হিসেবে ঘরের যাবতীয় আসবাবপত্র দিয়েছেন।
বিয়ের অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে নবদম্পতিকে আশীর্বাদ করেন সিলেট সিটি কর্পোরেশনের (সিসিক) প্রশাসক আব্দুল কাইয়ুম চৌধুরী।
তিনি বলেন, সমন্বিত শিশু পুনর্বাসন কেন্দ্র শুধু একটি আশ্রয়স্থল নয়, এটি যে একটি পরিবার হতে পারে আজ তার প্রমাণ মিলল।
স্বপ্নার পড়াশোনা ও বিয়ের মাধ্যমে তার ভবিষ্যতের যে ভিত্তি তৈরি হয়েছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়।
বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক সুচিত্রা রায় এবং জেলা সমাজসেবা কার্যালয়ের উপপরিচালক মো. আব্দুর রফিকসহ উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা এই আয়োজনে উপস্থিত ছিলেন।
সমাজসেবা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক এস. এম. মোক্তার হোসেন জানান, সম্পূর্ণ নিয়মতান্ত্রিকভাবে এবং স্বপ্নার উজ্জ্বল জীবনের নিশ্চয়তা পাওয়ায় এই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
পিতৃমাতৃহীন এক পথশিশুর নিরাপদ আশ্রয় থেকে শুরু করে স্বাবলম্বী হওয়া এবং শেষ পর্যন্ত সসম্মানে বিয়ের পিঁড়িতে বসার এই গল্পটি উপস্থিত সবার হৃদয় ছুঁয়ে যায়।
স্বপ্নার নতুন পথচলায় এখন শুধুই শুভকামনা।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply