
ফুলছড়িতে গুদাম থেকে দোকানে যাওয়ার আগেই সার বিক্রির অভিযোগ : বরাদ্দ অন্যত্র সরিয়ে নেওয়ারও অভিযোগ—দুর্বল মনিটরিং নিয়ে প্রশ্ন
রানা ইস্কান্দার রহমান।
গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি।
গাইবান্ধা জেলার ফুলছড়ি উপজেলাসহ জেলার বিভিন্ন এলাকায় সরকারি বরাদ্দের সার নিয়ে অনিয়ম, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি ও অতিরিক্ত দামে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। বিশেষ করে নদীবেষ্টিত ও দুর্গম চরাঞ্চলের কৃষকদের অভিযোগ, গুদাম থেকে নির্ধারিত ডিলারের বিক্রয়কেন্দ্রে পৌঁছানোর আগেই কোনো কোনো ক্ষেত্রে সার খুচরা ব্যবসায়ী ও কালোবাজারিদের কাছে হাতবদল হয়ে যাচ্ছে। আবার এক উপজেলার নামে বরাদ্দ করা সার অন্য উপজেলা, এমনকি জেলার বাইরেও চলে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ফলে কৃষি মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার সংগ্রহ করতে গিয়ে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন ফুলছড়ির এরেন্ডাবাড়ী, ফজলুপুরসহ নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলের হাজারো কৃষক। সরকারি নির্ধারিত মূল্যে সার পাওয়ার কথা থাকলেও সংকটের সুযোগ নিয়ে ৫০ কেজির এক বস্তা সারের ক্ষেত্রে স্থান ও পরিস্থিতি অনুযায়ী অতিরিক্ত ৫০০ থেকে ১ হাজার টাকা পর্যন্ত নেওয়ার অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা।
কৃষকদের অভিযোগ, সার সরবরাহ ও বিক্রয় ব্যবস্থাপনায় একটি অসাধু চক্র সক্রিয় রয়েছে। কোনো কোনো ডিলার গুদাম থেকে সার উত্তোলনের পর নিজস্ব বিক্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার আগেই তা খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে বিক্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বিএডিসি ডিলারদের পাশাপাশি বিসিআইসি ডিলারদের বরাদ্দ, উত্তোলন, সরবরাহ ও বিক্রয় নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়নের কৃষক আব্দুল কাদের বলেন, “আমাদের ইউনিয়নটি ফুলছড়ির মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন। মৌসুমে সার-বীজ সংগ্রহ করতে আমাদের অনেক কষ্ট হয়। কৃষি অফিসের লোকজনকে বারবার সমস্যার কথা জানিয়েও কার্যকর সমাধান পাইনি। সময়মতো সার না পেলে ফসলের কী হবে—এ নিয়ে আমরা দুশ্চিন্তায় থাকি।”
তিনি বলেন, কাগজে-কলমে সারের সংকট না থাকলেও মাঠের বাস্তব চিত্র ভিন্ন। জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে নিয়মিত মনিটরিং সভায় সরবরাহ স্বাভাবিক এবং নির্ধারিত মূল্যে সার বিক্রির কথা বলা হলেও কৃষকেরা সবসময় তার সুফল পাচ্ছেন না।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক কৃষক অভিযোগ করেন, অবৈধভাবে সার বিক্রি করা কিছু খুচরা ব্যবসায়ীও এ ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত। তাদের দাবি, অসাধু ডিলার ও খুচরা ব্যবসায়ীদের একটি অংশের যোগসাজশে বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে।
কৃষকদের আরও অভিযোগ, সার বিতরণ ও বিক্রয় তদারকির দায়িত্বে থাকা মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তাদের মনিটরিং ব্যবস্থা যথেষ্ট কার্যকর নয়। কেউ কেউ দায়িত্বপ্রাপ্ত কিছু কর্মকর্তার সঙ্গে অসাধু ডিলারদের ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের অভিযোগও করেছেন। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
কৃষক ও এরেন্ডাবাড়ী ইউনিয়ন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আব্দুল খালেক মাস্টার বলেন, “বর্তমান সরকার কৃষকের জন্য সারের কোনো কমতি রাখেনি। কিন্তু অসাধু সিন্ডিকেটের কারণে বাজারে গিয়ে কৃষকেরা সার পাচ্ছেন না। পাওয়া গেলেও বেশি দাম দিতে হচ্ছে। কৃষি অফিসে অভিযোগ করেও যদি সমাধান না হয়, তাহলে আমরা কার কাছে যাব?”
বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ফুলছড়ি উপজেলা শাখার সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা আবুল খায়ের বলেন, “বিভিন্ন সময় অনেক কৃষকের কাছ থেকে এ ধরনের অভিযোগ আসে। তাদের হয়রানির কথাগুলো নিয়মিত শুনতে হয়। আমি মনে করি, দ্রুত এসব সমস্যার সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।”
চরাঞ্চলের আরেক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “আমরা নদীর চরে ফসল ফলাই। একদিকে নদীভাঙন, অন্যদিকে যাতায়াতের কষ্ট। তার ওপর সার কিনতে গিয়ে অতিরিক্ত টাকা দিতে হলে ফসল করে লাভ কোথায়? সার কিনতেই যদি এত টাকা চলে যায়, তাহলে পরিবার চালাব কীভাবে?”
কৃষকদের অভিযোগের বিষয়ে ফুলছড়ি উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা খন্দকার ফিরোজ মাহমুদের সঙ্গে তাঁর ব্যবহৃত মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়। খুদে বার্তা পাঠিয়েও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তবে ফুলছড়ি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান বলেন, “বিষয়টি যাচাই করে দেখছি। মনিটরিং বৃদ্ধি করা হবে। একই সঙ্গে ডিলারদের গাফিলতি পাওয়া গেলে প্রয়োজনে আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হবে।”
ফুলছড়ির নদীবেষ্টিত চরাঞ্চলে সারের সংকটের প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এসব এলাকায় নৌপথনির্ভর যোগাযোগ এবং পরিবহন ব্যয়ের কারণে কৃষকদের বাড়তি অর্থ খরচ করতে হয়। এর সঙ্গে যদি অসাধু ব্যবসায়ীদের অতিরিক্ত মুনাফা যুক্ত হয়, তাহলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় আরও বেড়ে যায় বলে অভিযোগ।
কৃষকেরা বলছেন, সময়মতো সার না পাওয়ায় ফসলের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে প্রয়োজনীয় সার প্রয়োগ করা সম্ভব হয় না। এতে উৎপাদন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হচ্ছে। অথচ চরাঞ্চলের বিপুলসংখ্যক পরিবার সরাসরি কৃষির ওপর নির্ভরশীল।
কৃষকদের অভিযোগের সবচেয়ে বড় প্রশ্ন এখন জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সার মনিটরিং ব্যবস্থাকে ঘিরে। নিয়মিত সভা, বাজার তদারকি এবং ডিলারদের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থা থাকার পরও যদি কৃষকের কাছে নির্ধারিত মূল্যে সার পৌঁছানো না যায়, তাহলে সেই তদারকি কতটা কার্যকর—এ প্রশ্ন তুলছেন তাঁরা।
কৃষকদের দাবি, শুধু সভা করে ‘সার সংকট নেই’ ঘোষণা না দিয়ে সরেজমিনে ডিলারদের গুদাম, বিক্রয়কেন্দ্র, খুচরা বাজার এবং চরাঞ্চলের কৃষকদের কাছে সার পৌঁছানোর বাস্তব চিত্র দেখতে হবে।
তাঁরা বিএডিসি ও বিসিআইসি—উভয় শ্রেণির ডিলারের বরাদ্দ, উত্তোলন, পরিবহন ও বিক্রির তথ্য ডিজিটালভাবে যাচাই, নির্ধারিত মূল্যের বাইরে সার বিক্রি বন্ধ, অবৈধ খুচরা বিক্রেতাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা এবং এক উপজেলার বরাদ্দ অন্যত্র চলে যাচ্ছে কি না—তা কঠোরভাবে নজরদারির দাবি জানিয়েছেন।
সরকার কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমাতে ভর্তুকির মাধ্যমে সার সরবরাহ করছে। কিন্তু সেই ভর্তুকির সুবিধা যদি কৃষকের পরিবর্তে মধ্যস্বত্বভোগী ও অসাধু ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যায়, তাহলে সরকারের কৃষিবান্ধব উদ্যোগের উদ্দেশ্য কতটা বাস্তবায়িত হচ্ছে—এখন সেটিই বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply