
অটোভ্যান চুরির সাক্ষী হওয়ায় খুন শিশু রাজু অভিযুক্তের বাড়িতে অগ্নিযোগ
বগুড়া জেলা ক্রাইম রিপোর্টার:
বগুড়ার শেরপুরে নিখোঁজের দেড় দিন পর সাত বছর বয়সী শিশু রাজুর মরদেহ উদ্ধার করেছে পুলিশ। অটোভ্যান চুরির একমাত্র সাক্ষী হয়ে যাওয়ায় তাকে হত্যা করা হয়েছে বলে দাবি পুলিশের। এ ঘটনায় অটোভ্যান চুরি ও হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের খবর ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ গ্রামবাসী প্রধান অভিযুক্তের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন।
বৃহস্পতিবার (৬ আগস্ট) সন্ধ্যায় শেরপুর থানায় আয়োজিত সংবাদ ব্রিফিংয়ে এসব তথ্য জানান শেরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম মইনুদ্দীন।
নিহত রাজু (১১) শেরপুর উপজেলার সীমাবাড়ী ইউনিয়নের ররোয়া গ্রামের জনক আলমের ছেলে। বৃহস্পতিবার বিকেলে উপজেলার রানীরহাট বাজারসংলগ্ন এলাকা থেকে প্রায় ৩৫ কিলোমিটার দূরে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার বড়ইচড়া গ্রামের একটি ধানখেত থেকে তার মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
পুলিশ ও পরিবার সূত্রে জানা যায়, গত ৪ আগস্ট রাজুকে সঙ্গে নিয়ে বের হন একই গ্রামের বাসিন্দা মুস্তাকিম (২৪)। রাজু মাঝেমধ্যে মুস্তাকিমের ভগ্নিপতির মালিকানাধীন ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান চালিয়ে কৃষিকাজে সহায়তা করত। পুলিশের ভাষ্য, ভগ্নিপতির অটোভ্যানটি চুরির পরিকল্পনা করেছিলেন মুস্তাকিম। সেই পরিকল্পনা বাস্তবায়নের সময় রাজুকেও সঙ্গে নেওয়া হয়।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে পুলিশ জানায়, পরে মির্জাপুর এলাকার পুরোনো অটোভ্যান কেনাবেচার ব্যবসায়ী করিমের কাছে অটোভ্যানটি বিক্রির চেষ্টা করা হয়। কিন্তু রাজুকে সঙ্গে দেখে করিম আপত্তি জানান। তখন চুরির একমাত্র সাক্ষী হিসেবে শিশুটিকে বাঁচিয়ে রাখা যাবে না বলে সিদ্ধান্ত নেয় অভিযুক্তরা। পরে রাজুকে সিরাজগঞ্জের তাড়াশ উপজেলার একটি ধানখেতে নিয়ে হত্যা করে মরদেহ ফেলে রাখা হয় বলে প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে।
রাজুকে খুঁজে না পেয়ে পরিবারের সদস্যরা প্রথমে মুস্তাকিমের বাড়িতে খোঁজ করেন। পরে বৃহস্পতিবার দুপুর আড়াইটার দিকে রাজুর বাবা আলম শেরপুর থানায় মামলা করেন। মামলার পর তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহার ও গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পার্শ্ববর্তী রায়গঞ্জ উপজেলার একটি বাড়ি থেকে মুস্তাকিমকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে করিমকে আটক করা হয়। পরে তাদের দেখানো স্থান থেকে তাড়াশ উপজেলার বড়ইচড়া গ্রামের ধানখেত থেকে রাজুর মরদেহ উদ্ধার করা হয়। একই সঙ্গে করিমের শ্বশুরবাড়ি থেকে খণ্ড-বিখণ্ড অবস্থায় রাখা চুরি হওয়া অটোভ্যানের চারটি ব্যাটারি, দুটি চাকা, চেসিস ও একটি চার্জার উদ্ধার করা হয়েছে।
শেরপুর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) বিকাশ চক্রবর্তী বলেন, শিশুটির মাথা কাদামাটির নিচে চাপা অবস্থায় ছিল। মরদেহে পচন ধরেছিল এবং বাঁ পায়ে আঘাতের চিহ্ন পাওয়া গেছে। ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহ বগুড়ার শহীদ জিয়াউর রহমান মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের তদন্ত-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, মরদেহের অবস্থা দেখে ধারণা করা হচ্ছে, ৪ আগস্ট সন্ধ্যা বা রাতেই হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পাওয়ার পর মৃত্যুর সময় ও প্রকৃত কারণ নিশ্চিত হওয়া যাবে।
শিশুটির মরদেহ উদ্ধারের খবর এলাকায় ছড়িয়ে পড়লে ক্ষুব্ধ জনতা মুস্তাকিমের বাড়িতে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করে। ঘটনার সময় বাড়িতে পরিবারের কোনো সদস্য ছিলেন না বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
সংবাদ ব্রিফিংয়ে পুলিশের বিরুদ্ধে মামলা নিতে বিলম্বের অভিযোগও ওঠে। এ বিষয়ে পুলিশ জানায়, ৪ আগস্ট সন্ধ্যায় অভিযোগ পাওয়ার পর থেকেই তদন্ত শুরু হয় এবং ৬ আগস্ট দুপুরে আনুষ্ঠানিক মামলা নেওয়া হয়। প্রায় দেড় দিনের মধ্যেই আসামি গ্রেপ্তার, মরদেহ উদ্ধার এবং ঘটনার রহস্য উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে বলে দাবি পুলিশের। তাদের ভাষ্য, এটি ছিল একটি ‘ক্লুলেস’ অপহরণ ও হত্যার ঘটনা।
শেরপুর থানা পুলিশের পরিদর্শক (তদন্ত) জয়নুল আবেদিন জানিয়েছেন, “শুক্রবার গ্রেপ্তার আসামিকে আদালতে সোপর্দ করা হবে। জিজ্ঞাসাবাদে নতুন তথ্য পাওয়া গেলে রিমান্ডের আবেদন করা হবে। হত্যাকাণ্ডে অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাঁদেরও আইনের আওতায় আনা হবে বলে জানিয়েছে পুলিশ।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply