
খুলনায় ওএমএস ও টিসিবি পণ্য বিতরণে বড় ধরনের অনিয়ম-দুর্নীতির অভিযোগ, একই ডিলারের দুটি লাইসেন্স নিয়ে সিন্ডিকেটের আশঙ্কা
খুলনা মহানগরী ও আশপাশের এলাকায় সরকারের ভর্তুকিযুক্ত খাদ্য বিতরণ কর্মসূচি—ওপেন মার্কেট সেল (ওএমএস) এবং ট্রেডিং কর্পোরেশন অব বাংলাদেশ (টিসিবি)—এর পণ্য বিতরণে ব্যাপক অনিয়ম, কারচুপি ও সম্ভাব্য সিন্ডিকেটের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দা, ভোক্তা ও সচেতন মহলের অভিযোগ, একই ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের অধীনে ওএমএস এবং টিসিবির লাইসেন্স থাকায় একই দোকান বা পয়েন্টে দুই ধরনের ভর্তুকিযুক্ত পণ্য (চাল-আটা এবং তেল-চিনি-ডাল) বিতরণ হচ্ছে। এতে ওএমএসের চাল-আটা কোথায় যাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে এবং বড় ধরনের দুর্নীতির আশঙ্কা করা হচ্ছে।
সূত্র জানায়, খাদ্য অধিদপ্তরের অধীনে ওএমএস কর্মসূচিতে খুলনা জেলায় প্রায় ৯৬ জন ডিলার চাল ও আটা বিতরণ করেন। অন্যদিকে টিসিবির পণ্য (সয়াবিন তেল, চিনি, মসুর ডাল, ছোলা, খেজুর ইত্যাদি) বিক্রির জন্য আলাদা ডিলার নিয়োগ করা হয়। কিন্তু কিছু ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি বা পরিবারের সদস্যদের নামে দুটি লাইসেন্স থাকায় একই স্থানে দুই কর্মসূচির পণ্য বিক্রি হচ্ছে। ফলে ভোক্তারা অভিযোগ করছেন যে, ওএমএসের সরকারি চাল-আটা টিসিবির পণ্যের সঙ্গে মিশিয়ে বা অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। এতে প্রকৃত দরিদ্র ও নিম্নআয়ের মানুষ বঞ্চিত হচ্ছেন।
স্থানীয় একাধিক ভোক্তা জানান, টিসিবির পণ্য বিক্রি সাধারণত সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত চলে। কিন্তু অনেক ডিলার পয়েন্টে দুপুরের পরই “সার্ভার বন্ধ” বলে বিক্রি বন্ধ করে দেওয়া হয়। এ সময় অনেকে লাইনে দাঁড়িয়ে থেকেও পণ্য পান না। অভিযোগ রয়েছে, এই সুযোগে ডিলাররা অবশিষ্ট পণ্য কালোবাজারে বা উচ্চমূল্যে বিক্রি করছেন। খুলনার বয়রা বাজার, খালিশপুর, সোনাডাঙ্গাসহ বিভিন্ন এলাকায় এ ধরনের ঘটনা ঘটছে। সম্প্রতি র্যাব-৬ এর যৌথ অভিযানে বয়রা বাজারে একটি গোডাউন থেকে টিসিবির বিপুল পরিমাণ পণ্য (খেজুর, তেল ইত্যাদি) জব্দ করা হয়েছে এবং গোডাউন সিলগালা করা হয়েছে। একইভাবে দুটি প্রতিষ্ঠানকে ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়েছে।
খাদ্য অধিদপ্তরের একটি পূর্ববর্তী তদন্তে খুলনায় ওএমএসে ব্যাপক অনিয়ম পাওয়া গিয়েছিল। তদন্ত কমিটি ১৪টি সুপারিশ করেছিল, যার মধ্যে ডিলার নির্বাচন, মনিটরিং ও পণ্য বিতরণে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার কথা বলা হয়। কিন্তু অভিযোগ রয়েছে, এসব সুপারিশ পুরোপুরি বাস্তবায়ন হয়নি। টিসিবির ক্ষেত্রেও অতীতে খুলনা জোনে ২৭ জন ডিলারের লাইসেন্স বাতিলের সুপারিশ করা হয়েছিল অনিয়মের কারণে। সম্প্রতি রমজান উপলক্ষে টিসিবির ১৫টি স্পটে ট্রাকসেল শুরু হয়েছে, কিন্তু ডিলার পয়েন্টগুলোতে একই অভিযোগ উঠছে।
সচেতন নাগরিকরা মনে করেন, একই ডিলারের অধীনে দুটি কর্মসূচি চালু থাকলে দুর্নীতির সুযোগ বাড়ে। ওএমএসের চাল-আটা টিসিবির পণ্যের সঙ্গে মিলিয়ে বিতরণ করলে হিসাবের গরমিল হয় এবং সরকারি ভর্তুকি অপব্যবহার হয়। খাদ্য অধিদপ্তরের উচিত ওএমএস পয়েন্ট এক জায়গায় এবং টিসিবি পয়েন্ট অন্য জায়গায় রাখা, যাতে পণ্যের বিতরণ স্বচ্ছ ও পৃথক থাকে। এতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পণ্য সরানোর সুযোগ কমবে।
টিসিবির খুলনা আঞ্চলিক কার্যালয় সূত্রে জানা গেছে, রমজানে ফ্যামিলি কার্ডধারীদের পাশাপাশি সাধারণ মানুষও পণ্য কিনতে পারছেন। প্রতিদিন প্রতি ট্রাকে ৩৫০-৪০০ জন গ্রাহক পণ্য পাচ্ছেন। কিন্তু ডিলার পয়েন্টে সার্ভার সমস্যা বা অন্যান্য অজুহাতে বিক্রি বন্ধের অভিযোগ অস্বীকার করা হয়নি। খাদ্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, মনিটরিং জোরদার করা হচ্ছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণকারীরা দাবি করেছেন, প্রশাসনিক তদন্ত জরুরি। ডিলারদের লাইসেন্স যাচাই, পণ্যের স্টক রেজিস্টার চেক এবং সার্ভার লগ পরীক্ষা করা দরকার। অনেকে মনে করেন, এ ধরনের দুর্নীতি দীর্ঘদিনের। অতীতে টিসিবির ডিলার সমিতির নামে চাঁদাবাজির অভিযোগও উঠেছে।
খুলনা জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয় সূত্র জানায়, টিসিবি পণ্য বিক্রির সঙ্গে চাল সরবরাহকারী ডিলারদের তালিকা প্রকাশ করা হয়েছে। কিন্তু একই ডিলারের দ্বৈত ভূমিকা নিয়ে কোনো সুস্পষ্ট নির্দেশনা নেই। সচেতন মহলের দাবি, খাদ্য অধিদপ্তর ও টিসিবি যৌথভাবে তদন্ত কমিটি গঠন করে দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেবে। অন্যথায় সরকারের ভর্তুকি কর্মসূচি প্রকৃত উপকারভোগীদের কাছে পৌঁছাবে না।
এ বিষয়ে খুলনা র্যাব-৬ এর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, বাজার মনিটরিং অব্যাহত রয়েছে। যেকোনো অনিয়ম পেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সাধারণ মানুষকে অভিযোগ জানাতে অনুরোধ করা হয়েছে।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply