
কঠোর নিরাপত্তায় মোড়ানো সব ভোটকেন্দ্র
মোঃ আজগার আলী, জেলা প্রতিনিধি, সাতক্ষীরা:
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন (২০২৬) ঘিরে সাতক্ষীরা জেলার চারটি সংসদীয় আসনের ভোটাররা এখন প্রতিশ্রুতির জোয়ারে ভাসছেন। ভোট আসে, ভোট যায়—কিন্তু কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি—এমন আক্ষেপ দীর্ঘদিনের। তবুও দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি অংশগ্রহণমূলক ও প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ নির্বাচনের প্রত্যাশায় ভোটারদের মাঝে নতুন করে উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্রই চলছে জোর নির্বাচনী প্রচারণা।
নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ইতোমধ্যেই সাতক্ষীরার সব ভোটকেন্দ্র কঠোর নিরাপত্তার চাদরে ঢাকা হয়েছে। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, সেনাবাহিনী ও ৩৩ বিজিবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা সরাসরি মাঠ পর্যায়ে তদারকিতে রয়েছেন। প্রতিটি কেন্দ্রে আনসার সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে। ব্যালট বাক্সসহ প্রয়োজনীয় সব নির্বাচন সামগ্রী কেন্দ্রে পৌঁছে গেছে। আগেভাগেই বসানো হয়েছে সিসিটিভি ক্যামেরা এবং গড়ে তোলা হয়েছে চার স্তরের শক্ত নিরাপত্তা বলয়।
এবার সাতক্ষীরার চারটি আসনে মোট ১৯ জন প্রার্থী নির্বাচনী মাঠে রয়েছেন। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বিএনপি ও জামায়াতের প্রার্থীদের মধ্যে।
সাতক্ষীরা-১ (তালা-কলারোয়া) আসনে বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা হাবিবুল ইসলাম হাবিব এবং জামায়াতের অধ্যাপক ইজ্জত উল্লাহর মধ্যে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের আভাস মিলছে। দুই প্রার্থীই তালা-কলারোয়াকে সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজমুক্ত এলাকা হিসেবে গড়ে তোলার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। পাশাপাশি পাটকেলঘাটাকে উপজেলা এবং তালাকে পৌরসভায় রূপান্তরের ঘোষণা এসেছে। কলারোয়ায় আধুনিক স্টেডিয়াম, বাইপাস সড়ক, কৃষকদের জন্য ‘কৃষক কার্ড’, দুস্থদের জন্য ‘ফ্যামিলি কার্ড’, শিক্ষা ও সড়ক অবকাঠামো উন্নয়ন এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার অঙ্গীকারও রয়েছে।
সাতক্ষীরা-২ (সদর ও দেবহাটা) আসনে বিএনপির মো. আব্দুর রউফ, জামায়াতের মুহাদ্দিস আব্দুল খালেক ও জাতীয় পার্টির আশরাফুজ্জামান আশু প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁদের প্রতিশ্রুতির মধ্যে রয়েছে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসমুক্ত মানবিক রাষ্ট্র গঠন, সাতক্ষীরায় পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয় স্থাপন, সুন্দরবন টেক্সটাইল মিল পুনরায় চালু করে কর্মসংস্থান সৃষ্টি, জলাবদ্ধতা নিরসন এবং ভোমরা স্থলবন্দরকে আন্তর্জাতিক মানের আধুনিক বন্দরে রূপান্তর।
সাতক্ষীরা-৩ (আশাশুনি-কালিগঞ্জ) আসনে বিএনপির কাজী আলাউদ্দীন, জামায়াতের মুহাদ্দিস রবিউল বাশার এবং স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে জনপ্রিয় চিকিৎসক ডা. শহিদুল আলম ভোটের মাঠে লড়ছেন। এ আসনে জাতীয় পার্টির প্রার্থী এড. আলিফ হোসেনও রয়েছেন। প্রার্থীরা টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ, আশাশুনিকে পৌরসভা ঘোষণা, আধুনিক হিমাগার স্থাপন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকারি টেকনিক্যাল কলেজ, রেললাইন সংযোগ এবং সংখ্যালঘু ও নারীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
সাতক্ষীরা-৪ (শ্যামনগর) আসনে জামায়াতের সাবেক এমপি গাজী নজরুল ইসলাম এবং বিএনপির ড. মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী। তাঁদের ঘোষণায় রয়েছে সুন্দরবনকে ঘিরে আন্তর্জাতিক মানের পর্যটন কেন্দ্র, ২৫০ শয্যার হাসপাতাল, সুপেয় পানির সংকট নিরসন, জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি বেড়িবাঁধ, সামুদ্রিক বন্দর, কারিগরি বিশ্ববিদ্যালয়, মিনি এয়ারপোর্ট এবং মহসীন কলেজকে পূর্ণাঙ্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে রূপান্তরের পরিকল্পনা।
সব আসনেই বিএনপির প্রার্থীরা ‘১ কোটি কর্মসংস্থান’, ‘ফ্যামিলি কার্ড’ ও ‘কৃষক কার্ড’ কর্মসূচিকে বিশেষভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন।
এদিকে নির্বাচনের প্রস্তুতি হিসেবে সংসদ নির্বাচনের ব্যালট পেপার ইতোমধ্যেই সাতক্ষীরায় পৌঁছেছে। জেলা রিটার্নিং অফিস সূত্রে জানা গেছে, শুক্রবার ব্যালট পেপার এসে পৌঁছানোর পর সাতটি উপজেলার সহকারী রিটার্নিং কর্মকর্তার তত্ত্বাবধানে সেগুলো কঠোর নিরাপত্তায় সংরক্ষণ করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসক ও রিটার্নিং অফিসার মিজ আফরোজা আখতার মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) বিকেলে খুলনা রোড মোড়ে আয়োজিত প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও উৎসবমুখর নির্বাচন নিশ্চিত করতে চার স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়েছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সার্বক্ষণিক নজরদারিতে রয়েছে।
জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরায় মোট ভোটার ১৮ লাখ ৩২ হাজার ৫৮৯ জন। এর মধ্যে পুরুষ ৯ লাখ ১৭ হাজার ৭৩৯ জন, নারী ৯ লাখ ১৪ হাজার ৮২৭ জন এবং তৃতীয় লিঙ্গের ১৩ জন। তরুণ ভোটার (১৮–৩৫ বছর) ৬ লাখ ২৮ হাজার ৬০৯ জন, যার মধ্যে নতুন ভোটার ৬৭ হাজার ২৩৩ জন। জেলার ৬০৯টি ভোটকেন্দ্রে ৩ হাজার ৩৭২টি ভোটকক্ষ প্রস্তুত রয়েছে।
ভোটগ্রহণের দিন পর্যন্ত এই কঠোর নিরাপত্তা বলয় বজায় থাকবে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। শেষ মুহূর্তের প্রচারণায় ব্যস্ত প্রার্থীরা। আগামীকাল বৃহস্পতিবার ব্যালটের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে সাতক্ষীরার আগামী দিনের নেতৃত্ব।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply