
গাইবান্ধায় বিয়ে রেজিস্ট্রির নামে ভয়াবহ প্রতারণা, নথি জালিয়াতি ও দেনমোহর কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগে অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন আলোচিত কাজী মোঃ আব্দুল গোফ্ফার আকন্দ
রানা ইস্কান্দার রহমান।
গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি।
গাইবান্ধায় বিয়ে রেজিস্ট্রির নামে ভয়াবহ প্রতারণা, নথি জালিয়াতি ও দেনমোহর কমিয়ে দেওয়ার অভিযোগে অবশেষে গ্রেপ্তার হয়েছেন আলোচিত কাজী মোঃ আব্দুল গোফ্ফার আকন্দ। দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম, জাল কাবিননামা ও প্রতারণার অভিযোগে অভিযুক্ত এই কাজীকে ঘিরে জনমনে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। অবশেষে পুলিশের হাতে গ্রেপ্তারের খবরে স্বস্তি প্রকাশ করেছেন সাধারণ মানুষ।
অভিযোগ রয়েছে, গাইবান্ধার কিছু অসাধু কাজী বাল্যবিবাহ, ভুয়া কাবিননামা, নকল রেজিস্ট্রার বই ব্যবহার এবং মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে জালিয়াতির মাধ্যমে সাধারণ মানুষকে প্রতিনিয়ত প্রতারণার ফাঁদে ফেলছে। বিশেষ করে নিম্ন আয়ের পরিবারগুলো এসব প্রতারণার শিকার হয়ে মামলা-মোকদ্দমায় জড়িয়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে।
এরই ধারাবাহিকতায় গত ৪ মে গাইবান্ধা পৌর শহরের ১নং ওয়ার্ডের কাজী মোঃ আব্দুল গোফ্ফার আকন্দের বিরুদ্ধে ভয়াবহ জালিয়াতির লিখিত অভিযোগ ওঠে। অভিযোগটি প্রকাশ্যে আসার পর বিভিন্ন জাতীয় ও অনলাইন সংবাদমাধ্যমে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি হয়।
ভুক্তভোগী গাইবান্ধা সদর উপজেলার বল্লমঝাড় ইউনিয়নের কোমরপুর এলাকার মোছাঃ রিক্তা আক্তার শিখা অভিযোগ করেন, গত ১ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে গাইবান্ধা শহরের ডেভিড কোম্পানি পাড়ায় গোফ্ফার কাজীর অফিসে বোয়ালী ইউনিয়নের নশরৎপুর গ্রামের মোঃ শরিফ আল কামালের সঙ্গে তার বিয়ে সম্পন্ন হয়। সেখানে সাক্ষীদের উপস্থিতিতে ১০ লাখ টাকা দেনমোহর ধার্য করা হয়েছিল।
কিন্তু বিয়ের পর কয়েকদিন পেরিয়ে গেলেও কাবিননামা বুঝিয়ে না দিয়ে কালক্ষেপণ করতে থাকেন কাজী। পরে পৌর প্রশাসকের কাছে অভিযোগ করা হলে অভিযুক্ত কাজী একটি কাবিননামা দেখান, যেখানে দেনমোহরের পরিমাণ ১০ লাখ টাকার পরিবর্তে দেখানো হয় মাত্র ১ লাখ ১০ হাজার টাকা।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, মোটা অঙ্কের ঘুষের বিনিময়ে তার স্বামীর পক্ষ নিয়ে দেনমোহরের পরিমাণ গোপনে পরিবর্তন করে প্রতারণা করা হয়েছে। প্রতিবাদ করতে গেলে ভয়ভীতি ও হুমকি দিয়ে তাদের অফিস থেকে বের করে দেওয়া হয়।
এ ঘটনায় ভুক্তভোগী নারী লিখিত অভিযোগ দায়ের করলে তদন্তে নামে গাইবান্ধা সদর থানা পুলিশ। তদন্ত শেষে গত ১৪ মে ২০২৬ তারিখে অভিযুক্ত গোফ্ফার কাজী ও মোঃ শরিফ আল কামালের বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়।
স্থানীয়দের দাবি, এই গোফ্ফার কাজীর বিরুদ্ধে আগেও একাধিক প্রতারণা ও জালিয়াতির অভিযোগ উঠেছে। একাধিকবার কারাগারেও গেলেও রহস্যজনকভাবে বারবার ফিরে এসে একই অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছিলেন তিনি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন স্থানীয় বাসিন্দা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন,
“বিয়ের মতো পবিত্র সম্পর্ক নিয়েও যারা ব্যবসা করে, তারা সমাজের জন্য ভয়ংকর। এই ধরনের প্রতারকদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হলে সাধারণ মানুষ কখনো নিরাপদ থাকবে না।”
এ বিষয়ে গাইবান্ধা সদর থানার অফিসার ইনচার্জ আব্দুল্লাহ আল মামুন মুঠোফোনে জানান,
“অভিযুক্তকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তদন্তে আরও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। তাকে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে পাঠানো হবে।”
সচেতন মহলের দাবি, শুধু একজন কাজীকে গ্রেপ্তার করলেই দায় শেষ নয়। জেলার সকল ভুয়া ও অনিয়মকারী কাজীদের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান চালিয়ে বিয়ে রেজিস্ট্রি ব্যবস্থাকে দুর্নীতিমুক্ত করতে হবে। নইলে প্রতারণার এই অন্ধকার চক্র আরও ভয়ংকর রূপ নেবে।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply