
ফুলছড়ির ঐতিহ্যবাহী মরিচের হাটে কোটি টাকার বাণিজ্য, তবুও নেই স্থায়ী জায়গা-সরকারি বরাদ্দ ও জরুরি হস্তক্ষেপ এখন সময়ের দাবি
রানা ইস্কান্দার রহমান।
গাইবান্ধা জেলা প্রতিনিধি।
উত্তরাঞ্চলের চরভিত্তিক কৃষি অর্থনীতির অন্যতম প্রাণকেন্দ্র হয়ে উঠেছে গাইবান্ধার ফুলছড়ি উপজেলার ঐতিহ্যবাহী মরিচের হাট। প্রতি সপ্তাহে এখানে কোটি টাকার শুকনা মরিচ বেচাকেনা হলেও অবাক করার মতো বিষয়-এখনো গড়ে ওঠেনি কোনো স্থায়ী হাট বা নিজস্ব জায়গা। ব্যক্তি মালিকানাধীন জমি ভাড়া নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে চলছে এই গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যকেন্দ্র।
জেলা শহর থেকে প্রায় ২০ কিলোমিটার দূরে গজারিয়া ইউনিয়নের পুরাতন হেডকোয়ার্টার এলাকায় সপ্তাহে দুইদিন শনিবার ও মঙ্গলবার, সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত বসে এই হাট। গাইবান্ধার সদর, সাঘাটা, সুন্দরগঞ্জ ও ফুলছড়ি উপজেলার প্রায় ১৬৫টি চরের কৃষকদের উৎপাদিত মরিচ এখানে কেনাবেচা হয়। দেশের বিভিন্ন জেলা জামালপুর, নওগাঁ, রাজশাহী, দিনাজপুর, বগুড়া, রংপুরসহ রাজধানী ঢাকার পাইকাররা নিয়মিত আসেন এই হাটে।
হাটের দিন ভোর হতেই ব্রহ্মপুত্র নদঘাটে নৌকার পর নৌকা ভিড়তে থাকে। সাদা বস্তায় ভরা টকটকে লাল মরিচ নিয়ে কৃষকরা নদী পাড়ি দিয়ে ঘাটে পৌঁছান। এরপর প্রায় আধা কিলোমিটার বালুময় পথ হেঁটে কিংবা ঘোড়ার গাড়িতে করে হাটে আসেন। নারী ও শিশুরাও এই কষ্টসাধ্য যাত্রায় অংশ নেন-যা একদিকে যেমন সংগ্রামের গল্প, অন্যদিকে তেমনি গ্রামীণ অর্থনীতির বাস্তব চিত্র।
বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে জমে ওঠে কেনাবেচা। মরিচের মান অনুযায়ী উত্তম, মধ্যম ও নিম্ন-এই তিন শ্রেণিতে দাম নির্ধারণ করা হয়। তবে চলতি মৌসুমে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ার পরও প্রত্যাশিত দাম না পাওয়ার অভিযোগ রয়েছে কৃষকদের মধ্যে।
খাটিয়া মারির চরের কৃষক রিপন বলেন, ফসল ভালো হয়েছে, কিন্তু বাজারে দাম কম। এই হাটই আমাদের একমাত্র ভরসা, কিন্তু এখানে পর্যাপ্ত সুবিধা নেই।
হাটের ইজারাদার শওকত মির্জা রুস্তম বলেন, প্রতি হাটে সোয়া কোটি থেকে প্রায় দুই কোটি টাকার মরিচ বেচাকেনা হয়। এটি উত্তরাঞ্চলের অন্যতম বড় মরিচের হাট। কিন্তু নিজস্ব জায়গা না থাকায় আমরা ভাড়া করা জমিতে হাট চালাতে বাধ্য হচ্ছি।
তিনি আরও জানান, স্থায়ী হাটসেড, গুদাম, ব্যবসায়ীদের থাকার ব্যবস্থা কিংবা প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কিছুই নেই। এতে করে ব্যবসায়ীরা নানা সমস্যায় পড়ছেন, অনেক সম্ভাবনাও কাজে লাগানো যাচ্ছে না।
স্থানীয় ব্যবসায়ী ও পাইকাররা জানান, সড়ক ও ঘাট ব্যবস্থার উন্নয়ন, সংরক্ষণাগার এবং আধুনিক হাটসেড গড়ে তোলা গেলে এই হাট আরও বড় পরিসরে বিস্তৃত হতে পারবে। এতে কৃষকরা ন্যায্যমূল্য পাবেন, ব্যবসা বাড়বে এবং সরকারের রাজস্ব আয় উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি পাবে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নিকটবর্তী সরকারি খাস জমি শনাক্ত করে পরিকল্পিতভাবে একটি স্থায়ী হাট প্রতিষ্ঠা করা এখন সময়ের দাবি। এতে করে চরাঞ্চলের কৃষি পণ্য বাজারজাতকরণ সহজ হবে এবং জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ একসাথে:
ফুলছড়ির এই মরিচের হাট একদিকে যেমন বিশাল অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে, অন্যদিকে অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা ও প্রশাসনিক উদ্যোগের অভাবে সেই সম্ভাবনা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হচ্ছে না।
শেষ কথা:
চরাঞ্চলের কৃষকদের ঘামঝরা পরিশ্রমের এই বাজারকে টেকসই ও আধুনিক রূপ দিতে হলে এখনই প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ। সংশ্লিষ্ট প্রশাসন, স্থানীয় সরকার বিভাগ ও নীতিনির্ধারকদের কার্যকর পদক্ষেপই পারে ফুলছড়ির এই ঐতিহ্যবাহী হাটকে একটি পূর্ণাঙ্গ, স্থায়ী ও জাতীয় মানের বাণিজ্যকেন্দ্রে রূপ দিতে।
© All rights reserved © 2025
Leave a Reply