প্রমোট মহিলা হোস্টেলের উন্নয়নকাজের তথ্য চাওয়ায় সাংবাদিকদের ধমকালেন শিক্ষা কর্মকর্তা
গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলা ‘প্রমোট’ মহিলা হোস্টেলের সংস্কার ও উন্নয়নকাজে বিভিন্ন অসংগতির অভিযোগ উঠেছে। সরকারি এই কাজের ব্যয়, অনুমোদন ও নথিপত্রের তথ্য জানতে চাওয়ায় সাংবাদিকদের ওপর ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বি এম নকিবুল হাসান। তথ্য দেওয়ার পরিবর্তে সাংবাদিকদের উদ্দেশ্যে তিনি বলেন, “বেশি ইন্টারেস্ট শো করো না, ফোন রাখ।” সরকারি একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তার এমন আচরণে ক্ষোভ ও প্রশ্ন উঠেছে স্থানীয় সচেতন মহল ও সাংবাদিকদের মাঝে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, প্রমোট মহিলা হোস্টেলের সংস্কার ও উন্নয়নকাজে প্রায় ৩ লাখ টাকা ব্যয়ের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে এই অর্থের মূল উৎস, সংগৃহীত ভাড়া জমার ব্যাংক হিসাব এবং তা খরচে প্রশাসনিক অনুমোদন রয়েছে কি না—এ নিয়ে নানামুখী প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। কাজের কারিগরি প্রাক্কলন ও বাস্তবায়নের পদ্ধতিতেও পাওয়া গেছে একাধিক অসংগতি।
২০২৫ সালে গাইবান্ধার তৎকালীন জেলা প্রশাসক চৌধুরী মোয়াজ্জেম আহমেদের উদ্যোগে ১৫ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়, যার প্রধান করা হয় উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা নকিবুল হাসানকে। তবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ওই কমিটির অনেক সদস্য কাজের বিষয়ে কিছুই জানেন না। কেউ কেউ দাবি করেছেন, তালিকায় তাদের নাম বা স্বাক্ষর থাকলেও উন্নয়নকাজের বিস্তারিত সম্পর্কে তাদের অন্ধকারের রাখা হয়েছে।
কমিটিতে গাইবান্ধা জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক নার্গিস আক্তারের উপস্থিতি দেখানো হলেও তিনি জানান, ওই হোস্টেলের কোনো সভা বা কমিটিতে তার থাকার কথা নয় এবং তিনি বিষয়টি সম্পর্কে অবহিত নন।
অন্যদিকে, মেরামত কাজের জন্য তৈরি করা এস্টিমেট নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীর স্বাক্ষর থাকার কথা থাকলেও সেখানে তা নেই। এমনকি কমিটিতে থাকা সহকারি প্রকৌশলীর নাম কেটে উপসহকারী প্রকৌশলী আতিকুর রহমানের নাম যুক্ত করা হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এ বিষয়ে শিক্ষা প্রকৌশল অধিদপ্তরের সহকারী প্রকৌশলী আলামিন জানান, মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের অনুরোধে তিনি উপসহকারী প্রকৌশলীকে সহযোগিতার কথা বলেছিলেন, তবে কাজের কোনো অফিশিয়াল সার্কুলার বা রেজুলেশন তাকে দেখানো হয়নি। উপসহকারী প্রকৌশলী আতীকুর রহমানও স্বীকার করেছেন, স্যারের নির্দেশ পেয়ে শুধু স্বাক্ষর করেছেন।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি নিয়ম অনুযায়ী কাজের দরপত্র বা স্বচ্ছ প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে শিক্ষা কর্মকর্তা নিজেই সবকিছু তদারক করছেন। গাইবান্ধা শহর থেকে নিজের গাড়িতে করে মিস্ত্রি ও শ্রমিকদের পলাশবাড়ীতে এনে দিনভর কাজ করিয়ে সন্ধ্যায় আবার পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। এছাড়া প্রশাসনিক তদারকি এড়াতে কাজটিকে নিজের মতো চারটি ভাগে ভাগ করে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে।
তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে শিক্ষা কর্মকর্তা বি এম নকিবুল হাসান দাবি করেন, “এটি সরকারি অর্থায়নের কাজ নয়। হোস্টেলে বসবাসকারীদের ভাড়ার টাকা ইউএনও এবং আমার যৌথ ব্যাংক হিসাবে জমা থাকে। জেলা প্রশাসকের অনুমতি নিয়ে সেই টাকা দিয়েই সংস্কারকাজ চালানো হচ্ছে।”
তবে ২০২৫ সালের রেজুলেশন দিয়ে ২০২৬ সালে এসে নতুন কোনো অনুমোদন ছাড়া কীভাবে কাজ চলছে এবং সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাড়া আদায়ের অর্থ কোন বিধিবলে সরাসরি খরচ করা হচ্ছে—তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েই গেছে। স্বচ্ছতার স্বার্থে ব্যাংক বিবরণী, খরচের অনুমোদনপত্র, প্রাক্কলন, কাজের আদেশ ও বিল-ভাউচার জনসম্মুখে প্রকাশের দাবি উঠেছে।
পলাশবাড়ী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বিষয়টি অনুসন্ধানের জন্য সাংবাদিকদের ধন্যবাদ জানান এবং শিক্ষা কর্মকর্তা নকিবকে প্রয়োজনীয় তথ্য সরবরাহের নির্দেশ দিয়েছেন বলে নিশ্চিত করেন। তবে ইউএনওর নির্দেশ সত্ত্বেও সাংবাদিকদের তথ্য না দিয়ে উল্টো অসৌজন্যমূলক আচরণ করেন ওই কর্মকর্তা।
শিক্ষা কর্মকর্তার আচরণের তীব্র নিন্দা জানিয়ে গাইবান্ধা প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক ইদ্রিসউজ্জামান মোনা বলেন, “সরকারি বা জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আয়-ব্যয় ও উন্নয়নকাজ নিয়ে প্রশ্ন করা সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব। তথ্য প্রকাশে বাধা দেওয়া ও অসৌজন্যমূলক আচরণ করার ঘটনা কোনোভাবেই কাম্য নয়। ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও নথিপত্র প্রকাশ্যে আনা উচিত।”
সারাদেশের বিভিন্ন উপজেলায় ইউরোপীয় অর্থায়নে নির্মিত ‘প্রমোট’ কর্মজীবী মহিলা হোস্টেল রয়েছে, যা হস্তান্তরের পর উপজেলা প্রশাসন পরিচালনা করে আসছে। তবে পলাশবাড়ীর এই হোস্টেলটি কোন সালে, কত খরচে এবং কোন প্রকল্পের অধীনে নির্মিত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে কার কাছে কীভাবে হস্তান্তর করা হয়—তার মূল নথিপত্রও এখন ধোঁয়াশায়চ্ছন্ন।
প্রশাসন ও সুশীল সমাজের মতে, প্রমোট মহিলা হোস্টেলের প্রতিষ্ঠা থেকে শুরু করে বর্তমান উন্নয়নকাজের প্রশাসনিক অনুমোদন, রেজুলেশন, প্রাক্কলন ও বিল-ভাউচার জনসমক্ষে প্রকাশ করা হলেই কেবল এই প্রকল্পের প্রকৃত চিত্র ও অনিয়মের সত্যতা স্পষ্ট হবে।
প্রকাশক মোঃ জিল্লুর রহমান <br>
বার্তা সম্পাদক মোঃ আলমগীর রতন মন্ডল <br>
সম্পাদক মোঃ রানা ইস্কান্দার রহমান <br>
নির্বাহী সম্পাদক মোঃ আঃ রাজ্জাক সরকার <br>
ব্যবস্থাপনা সম্পাদক মোঃ আঃ হালিম সরকার <br>
প্রধান কার্যালয়ঃ ঢাকা মিরপুর ১২ পল্লবী থানা পল্লবী মহল্লা মোবাইল নং <br>
01859667602
Copyright © 2026 durnitirtalashteam.com. All rights reserved.