চিলমারী বন্দরে নেই ন্যূনতম যাত্রীসেবা, ২ কোটি টাকায় ঘাট ইজারা হলেও ভোগান্তিতে হাজারো যাত্রী
মোঃ জাফর আহমেদ, কুড়িগ্রাম জেলা সংবাদদাতা
১৮ আগস্ট ২০২৬
ব্রহ্মপুত্র নদের তীরে অবস্থিত ঐতিহ্যবাহী চিলমারী নদীবন্দর সময়ের সঙ্গে হারিয়েছে তার পুরোনো জৌলুস। তবে বন্দরটির গুরুত্ব এখনও কমেনি। রৌমারী, রাজীবপুরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলের হাজারো মানুষ প্রতিদিন এই নৌপথে যাতায়াত করেন। অথচ বিপুলসংখ্যক যাত্রীর ব্যবহার করা এই বন্দরে নেই ন্যূনতম নাগরিক ও যাত্রীসেবা। এমনকি একটি গণশৌচাগারও নেই। ফলে দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে ঘাটে পৌঁছানো যাত্রীদের পড়তে হচ্ছে চরম ভোগান্তিতে। সবচেয়ে বেশি দুর্ভোগের শিকার হচ্ছেন নারী, শিশু ও বয়স্করা।
শুধু শৌচাগারের সংকটই নয়, ঘাটে ভেড়া ট্রলার থেকে ঝুঁকি নিয়ে তীরে উঠতে হচ্ছে যাত্রীদের। বসার ছাউনি ও পর্যাপ্ত সুপেয় পানির ব্যবস্থাও নেই বলে অভিযোগ রয়েছে। অথচ চলতি অর্থবছরে চিলমারী নদীবন্দর ঘাটটি এক কোটি ৯৪ লাখ টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে। বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় হলেও যাত্রীসেবায় তার প্রতিফলন নেই বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
যাত্রীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, রৌমারী, রাজীবপুর ও বিভিন্ন চরাঞ্চল থেকে নৌকায় চিলমারী বন্দরে পৌঁছাতে সময় লাগে প্রায় দুই থেকে তিন ঘণ্টা। দীর্ঘ নদীপথ পাড়ি দিয়ে ঘাটে পৌঁছানোর পর জরুরি প্রয়োজনে কোনো শৌচাগার না থাকায় বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হয় যাত্রীদের। অনেকে বাধ্য হয়ে আশপাশের বাসাবাড়িতে গিয়ে শৌচাগার ব্যবহারের অনুরোধ করেন। আবার লোকলজ্জার কারণে কেউ কেউ নদীর তীরের খোলা জায়গায় প্রাকৃতিক কাজ সারতে বাধ্য হন।
এতে একদিকে যেমন যাত্রীদের ব্যক্তিগত ভোগান্তি বাড়ছে, অন্যদিকে দূষিত হচ্ছে নদীবন্দর এলাকার পরিবেশ। খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগের কারণে স্বাস্থ্যঝুঁকিও তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে এসব বর্জ্য পানির সঙ্গে মিশে পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়াতে পারে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য সংশ্লিষ্টরা।
নিয়মিত এই নৌপথ ব্যবহারকারী শাহ্ মোমেন বলেন, “রৌমারী ও রাজীবপুর যেতে নৌকায় দীর্ঘ সময় লাগে। ঘাটে এসে শৌচাগার দরকার হলে আশপাশের বাড়িতে যেতে হয়। এখানে একটি গণশৌচাগার থাকা খুবই জরুরি।”
নারী যাত্রী শামসুন্নাহার বেগম বলেন, “পুরুষরা কোনোভাবে বাইরে কাজ চালিয়ে নিতে পারেন। কিন্তু নারীদের জন্য বিষয়টি অত্যন্ত কঠিন ও কষ্টদায়ক। ঘাটে নেমে শৌচাগার না থাকায় দীর্ঘক্ষণ চাপ সহ্য করতে হয়, নতুবা অপরিচিত মানুষের বাড়িতে যেতে হয়।”
স্থানীয় সূত্র জানায়, চিলমারী বন্দর দিয়ে প্রতিদিন অন্তত ৫০টি নৌযান চলাচল করে। প্রতিটি নৌযানে গড়ে ৮০ থেকে ১০০ জন যাত্রী থাকেন। সে হিসাবে প্রতিদিন প্রায় চার থেকে পাঁচ হাজার মানুষ এই ঘাট ব্যবহার করেন। এত বিপুলসংখ্যক যাত্রীর জন্য একটি গণশৌচাগারসহ মৌলিক সুবিধা না থাকাকে চরম অব্যবস্থাপনা হিসেবে দেখছেন স্থানীয়রা।
রমনা ঘাটের ঘাটমাস্টার মো. সিদ্দিক বলেন, “ঘাট থেকে সরকার প্রতি বছর কোটি কোটি টাকা রাজস্ব পেলেও যাত্রীসেবা একেবারেই শূন্য। নদীবন্দরে গণশৌচাগার স্থাপনের জন্য বিআইডব্লিউটিএকে জানানো হলেও এখন পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।”
চিলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আমিনুল ইসলাম বলেন, “জনসমাগমপূর্ণ নদীবন্দরে পর্যাপ্ত শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা না থাকলে স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষ করে খোলা জায়গায় মলমূত্র ত্যাগের কারণে পরিবেশ দূষণের পাশাপাশি ডায়রিয়া, আমাশয় ও বিভিন্ন পানিবাহিত রোগের ঝুঁকি বাড়ে। যাত্রীদের স্বাস্থ্য সুরক্ষায় দ্রুত নিরাপদ শৌচাগার ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা জরুরি।”
এদিকে বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআইডব্লিউটিএ) বন্দর উন্নয়ন প্রকল্প পাঁচ বছর ধরে চললেও বাস্তব অগ্রগতি হয়েছে মাত্র ৩৪ শতাংশ। দীর্ঘদিন ধরে উন্নয়নকাজ চললেও ঘাটে যাত্রীসেবার মৌলিক সুবিধা বাড়েনি। স্থানীয়দের অভিযোগ, পর্যাপ্ত নজরদারি ও পরিকল্পনার অভাবে বন্দরের অবকাঠামোগত উন্নয়নের সঙ্গে যাত্রীসেবার সমন্বয় ঘটছে না।
বিআইডব্লিউটিএর নদীবন্দরের পোর্ট অফিসার পুতুল চন্দ্র বলেন, “আপাতত আলাদা গণশৌচাগার নির্মাণের কোনো সিদ্ধান্ত নেই। ইতোমধ্যে বন্দরের প্যাসেঞ্জার টার্মিনালের কাজ শেষ হয়েছে। সেখানে যাত্রীদের জন্য পর্যাপ্ত টয়লেটের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেটি নির্মাণকাজ শেষ হলে টার্মিনালটি যাত্রীদের জন্য উন্মুক্ত করা হবে। তখন আর এই সমস্যা থাকবে না।”
তবে স্থানীয় যাত্রীদের প্রশ্ন—জেটি ও টার্মিনালের কাজ শেষ হওয়ার আগ পর্যন্ত হাজারো মানুষকে এই ভোগান্তি পোহাতে হবে কেন? প্রতিবছর বিপুল অঙ্কের রাজস্ব আদায় করা হলেও একটি জনবহুল নদীবন্দরে গণশৌচাগার, নিরাপদে তীরে ওঠার ব্যবস্থা, বসার ছাউনি ও সুপেয় পানির মতো মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত না হওয়া প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বড় ঘাটতি বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
চিলমারী নদীবন্দরকে আধুনিক ও যাত্রীবান্ধব করতে হলে শুধু অবকাঠামো নির্মাণ নয়, মানুষের দৈনন্দিন প্রয়োজনকে গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্ক যাত্রীদের কথা বিবেচনায় নিয়ে নিরাপদ শৌচাগার, সুপেয় পানি, বসার ব্যবস্থা এবং ঝুঁকিমুক্ত নৌযান ওঠানামার ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
প্রকাশক ও সম্পাদক, মোঃ জিল্লুর রহমান,০১৮৫৯-৬৬৭৬০২,০১৭০৭-৫০১৪১৪নি,র্বাহী সম্পাদক, মোঃ আঃ রাজ্জাক সরকার, বার্তা সম্পাদক, মোঃ রতন মন্ডল
প্রধান কার্যালয়ঃ মিরপুর ১২ ঢাকা ১২১৬,mail: jillumia87@gmail.com
Copyright © 2026 দুর্নীতির তালাশ টিম. All rights reserved.