হরিদাস ওরফে তাওহিদ ইসলামের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবিতে ময়মনসিংহে ভুক্তভোগীদের মানববন্ধন।
অর্থপাচার মামলায় হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ওরফে তাওহীদ ইসলামকে গ্রেপ্তারের পর এবার প্রতারণা মামলায় সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে ময়মনসিংহ জেলা যুগ্ম দায়রা জজ (অর্থ ও ঋণ) আদালতে শ্যোন অ্যারেস্ট দেখানো হয়েছে। পরে আদালত তাকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেয়।
এদিকে প্রতারণার শিকার ব্যক্তিরা বুধবার মানববন্ধন করে তাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট বলে অভিযোগ তুলে তার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান।
আদালতের সরকারি কৌঁসুলি (পিপি) অ্যাডভোকেট মো. আনোয়ার আজিজ টুটুল জানান, ঢাকা জেলার একটি মামলায় গ্রেপ্তার হওয়ার পর ফুলবাড়িয়া থানার দায়ের করা প্রতারণা মামলার সাজাপ্রাপ্ত আসামি হিসেবে তাকে আদালতে হাজির করা হয়। কোতোয়ালি সিআর মামলা নং-১৪৯১/২০১২ (এনআই অ্যাক্টের ১৩৮ ধারা) থেকে উদ্ভূত ৩২১৮/২০২৩ নম্বর মামলায় তার এক বছরের কারাদণ্ড হয়। দীর্ঘদিন তিনি পলাতক ছিলেন।
প্রতারণার শিকারদের মানববন্ধন, দোষি ব্যাক্তির সর্বোচ্চ শাস্তি দাবি করে বুধবার দুপুর ১২টার দিকে ময়মনসিংহ প্রেসক্লাবের সামনে প্রতারণার শিকার প্রায় ৪০ জন ব্যক্তি ও ফুলবাড়িয়ার ৬০-৭০ জন সাধারণ মানুষ মানববন্ধন করেন।
মানববন্ধনে তাদের দাবি, হরিদাস চন্দ্র তরণী ওরফে তাওহীদ ইসলাম চাকরি, সরকারি ঘর, সেচের পাম্প, বিভিন্ন সরকারি সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার নামে এবং ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে বাকিতে পণ্য নিয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। মানববন্ধনে বক্তারা তাকে ভারতের গোয়েন্দা সংস্থা ‘র’-এর এজেন্ট বলে অভিযোগ করে তার সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। মানববন্ধন শেষে অংশগ্রহণকারীরা জেলা প্রশাসকের মাধ্যমে প্রধানমন্ত্রী বরাবর একটি স্মারকলিপি জমা দেন।
নতুন প্রতারণা মামলা।
মেসার্স শফিক ট্রেডার্সের স্বত্বাধিকারী শফিকুল ইসলাম জানান, মসজিদ-মাদরাসার উন্নয়নের কথা বলে হরিদাস তার প্রতিষ্ঠান থেকে রড, সিমেন্টসহ বিভিন্ন নির্মাণসামগ্রী ১৪ লাখ ৫২ হাজার ৩৪০ টাকা মূল্যের বাকিতে নেন। পরে তিনি টাকা পরিশোধ করেননি।
এ ঘটনায় গত ৯ জুলাই ২০২৬ শফিকুল ইসলাম আদালতে মামলা দায়ের করেন। আদালত মামলাটি আমলে নিয়ে ফুলবাড়িয়া থানাকে এফআইআর হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করার নির্দেশ দেন। মামলার পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য রয়েছে ২৬ জুলাই ২০২৬।
এ ছাড়া গত ২৫ জুন ২০২৬ মো. আবুল কাশেম নামের এক ব্যক্তি হরিদাসের বিরুদ্ধে একটি চেক ডিজঅনারের অভিযোগে মামলা করেন। আদালতের নির্দেশে ৩০ জুন তার বর্তমান ও স্থায়ী ঠিকানায় আইনগত নোটিশ পাঠানো হয়।
এদিকে, ফুলবাড়িয়ায় রিসোর্ট নির্মাণের জন্য এক ব্যক্তির কাছ থেকে ৬০ লাখ টাকা নিয়ে তা ফেরত না দেওয়ার অভিযোগে তার বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের হয়েছে। পাশাপাশি চাকরি দেওয়ার নামে প্রতারণার অভিযোগেও বুধবার তার বিরুদ্ধে পৃথক আরেকটি মামলা হয়েছে।
চাকরির নামে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
চাকরি দেওয়ার নাম করে শত শত চাকরি প্রার্থীর কাছ থেকে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছেন হরিদাস।
মানববন্ধনে ফুলবাড়িয়া পৌর শহরের বাসিন্দা আবুল কালাম অভিযোগ করেন, তার সন্তানের চাকরির ব্যবস্থা করে দেওয়ার কথা বলে হরিদাস প্রথমে ১৩ লাখ টাকা নেন। পরে সেচের পাম্প ও সরকারি ঘর পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে আরও ২২ লাখ টাকা নেন। কিন্তু কোনো প্রতিশ্রুতিই বাস্তবায়ন করেননি এবং টাকাও ফেরত দেননি বলে দাবি করেন তিনি।
অর্থ পাচার তদন্ত অব্যাহত, সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম ইউনিট বর্তমানে হরিদাসের নামে-বেনামে পরিচালিত ব্যাংক হিসাব, এমএফএস লেনদেন, জমি, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান, ফুলবাড়িয়ার রিসোর্টে বিনিয়োগ এবং সম্পদের বৈধতা যাচাই করছে। একই সঙ্গে তার আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের ভূমিকাও তদন্তের আওতায় রয়েছে।
এর আগে গত ১২ জুলাই রাতে গাইবান্ধার পলাশবাড়ী থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) তাকে মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইনের মামলায় গ্রেপ্তার করে। তদন্তে তার ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) হিসাবে প্রায় ৯ কোটি ৩৫ লাখ টাকার সন্দেহজনক লেনদেনের তথ্য পাওয়ার দাবি করেছে সিআইডি। চার দিনের রিমান্ড শেষে ১৬ জুলাই তাকে কারাগারে পাঠানো হয়।
কে এই হরিদাস?
অনুসন্ধানে জানা যায়, গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার মধ্যরামচন্দ্রপুর গ্রামের বাসিন্দা হরিদাস চন্দ্র তরণী দাস ২০১০ সালে ভারত থেকে দেশে ফিরে রাজধানীর উত্তরায় পুরোনো এসি কেনাবেচা, মেরামত ও ইলেকট্রিক্যাল কাজ শুরু করেন।
গোয়েন্দা সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, ২০১৯ সালে তিনি ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে ‘তাওহীদ ইসলাম’ নাম ব্যবহার শুরু করেন এবং ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার ছাইতানতলা এলাকার এক তরুণীকে বিয়ে করেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, বিয়ের পর তিনি দরিদ্র মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মাধ্যমে এলাকায় প্রভাব বিস্তার শুরু করেন। পরে সরকারি ঘর, নলকূপ, চাকরি, বদলি ও টেন্ডার পাইয়ে দেওয়ার আশ্বাস দিয়ে অসংখ্য মানুষের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ ওঠে।
ফুলবাড়িয়ায় বিলাসবহুল রিসোর্ট, সম্পদের উৎস নিয়ে প্রশ্ন।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ফুলবাড়িয়ার বালিয়ান এলাকায় প্রায় ১৩ শতাংশ জমি কিনে পতিত শেখ হাসিনার ঘনিষ্ঠ পরিচয় দিয়ে পাশের সরকারি খাস জমি ও খালের অংশ দখল করে চার কোটি টাকা ব্যয়ে বিলাসবহুল ভবন নির্মাণ করা হয়।
প্রথমে চিকিৎসালয় নির্মাণের কথা বলা হলেও পরে সেখানে সুইমিংপুল, কটেজ ও বিনোদনকেন্দ্র গড়ে তোলা হয়। বর্তমানে এটি 'প্যারিস সুইমিংপুল এন্টারটেইনমেন্ট পার্ক' নামে পরিচিত।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওই রিসোর্টে আওয়ামী সরকারের সময় অসামাজিক কর্মকাণ্ড চলত। এসব বিষয়ে প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক অভিযোগ দেওয়া হলেও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
৮১ ফুট রামমূর্তি নিয়ে বিতর্ক
চলতি বছরের জুনে গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে ৮১ ফুট উচ্চতার রামমূর্তি নির্মাণের ঘোষণা দিয়ে আবারও জাতীয় আলোচনায় আসেন হরিদাস। প্রকল্পটির অর্থায়নের উৎস নিয়ে বিভিন্ন মহলে প্রশ্ন ওঠে। পরে স্থানীয় মন্দির কর্তৃপক্ষ নির্মাণকাজ স্থগিতের ঘোষণা দেয়।
#follower #highlightseveryone
প্রকাশক ও সম্পাদক, মোঃ জিল্লুর রহমান,০১৮৫৯-৬৬৭৬০২,০১৭০৭-৫০১৪১৪নি,র্বাহী সম্পাদক, মোঃ আঃ রাজ্জাক সরকার, বার্তা সম্পাদক, মোঃ রতন মন্ডল
প্রধান কার্যালয়ঃ মিরপুর ১২ ঢাকা ১২১৬,mail: jillumia87@gmail.com
Copyright © 2026 দুর্নীতির তালাশ টিম. All rights reserved.