রাজপথের ‘খড়কুটো’ বনাম ক্ষমতার হালুয়া-রুটি: কর্মী, তোমার বিবেক জাগবে কবে?
প্রফেসর ড. আসিফ মিজান, উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং রাজনীতি বিশ্লেষক।
দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতির ইতিহাসে বাংলাদেশ এক অনন্য ও বৈচিত্র্যময় ভূখণ্ড। কিন্তু এই দেশের রাজনীতির সবচেয়ে অন্ধকার দিকটি হলো—এখানে কর্মীর জীবন দেওয়া মানেই দলকে ক্ষমতায় আনা। স্বাধীনতার পর থেকে বিগত ৫ দশকেরও বেশি সময় ধরে দেশের রাজনৈতিক সমীকরণগুলো পর্যবেক্ষণ করলে একটি নির্মম সত্য বারবার সামনে আসে। দল ক্ষমতায় আসা মানেই মাঠপর্যায়ের ত্যাগী কর্মীদের মূল্যায়ন নয়, বরং কিছু শীর্ষ নেতা, পাতিনেতা এবং তাদের আত্মীয়স্বজনের জন্য রাষ্ট্রীয় সম্পদ ও ক্ষমতার ‘হালুয়া-রুটির’ মহা বন্দোবস্ত পাকাপাকি হওয়া। বিভিন্ন মিডিয়া ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের তথ্য-উপাত্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, ক্ষমতার পরিবর্তনের সাথে সাথে কীভাবে রাতারাতি সিন্ডিকেট, টেন্ডারবাজি এবং অর্থ পাচারের নতুন নতুন সুবিধাভোগী গোষ্ঠী তৈরি হয়। ক্ষমতার এই চিরন্তন বৃত্তে সাধারণ, নিঃস্বার্থ মাঠকর্মীর প্রাপ্তি কেবল নেতাদের সাথে ‘৩২ দাঁত বের করা’ একখান ছবি তোলা, যা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে পোস্ট করেই তাকে সান্ত্বনা খুঁজতে হয়।
রক্তের মূল্যে ক্ষমতার পালাবদল, কর্মীর ভাগ্যে চিরন্তন অমাবস্যাঃ
বিগত বছরগুলোর রাজনৈতিক সংঘাতের পরিসংখ্যান এবং বিভিন্ন জাতীয় দৈনিকের অনুসন্ধানী প্রতিবেদনগুলো ওল্টালে গা শিউরে ওঠে। নির্বাচনের আগে ও পরে হওয়া রাজনৈতিক সহিংসতায় প্রতি বছর শত শত তাজা প্রাণ ঝরে যায়। কিন্তু যে কর্মী মারা গেলো বা রাজনৈতিক প্রতিহিংসার শিকার হয়ে খুন হলো—তার পরিবারের খোঁজ কয়জন রাখে? সেই পরিবারগুলো রাষ্ট্র বা দল থেকে কোনো টেকসই পুনর্বাসন পায় না; বরং চিরকালের জন্য পতিত হয় এক অতল শোক আর চরম অর্থনৈতিক অনটনের সাগরে। আবার আন্দোলনের মাঠে পুলিশের লাঠি কিংবা প্রতিপক্ষের বোমায় যে কর্মী আজীবনের জন্য পঙ্গু হয়ে গেলো, তার চিকিৎসা খরচটুকু জোগাতেও তার পরিবারকে ঘটিবাটি বিক্রি করতে হয়। তাদের জীবনের ঘোর অমাবস্যা আর কখনো কাটে না। অকাট্য যুক্তি ও বাস্তব চিত্র এটাই বলে—কর্মীর জীবনের দামে, রক্তের স্রোতে রাজপথে ক্ষমতার পালাবদল ঠিকই ঘটে, কিন্তু কর্মীর নিজের জীবনের ভাগ্যবদল বা সামাজিক নিরাপত্তার কোনো পরিবর্তন হয় না। কেননা, আমাদের দেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে নেতাদেরই সব লাগে, সব—সব ধরনের রাষ্ট্রীয় প্রটোকল, পদ-পদবি, ব্যবসা আর সুযোগ-সুবিধা তাদেরই চাই। সাধারণ কর্মীর পানে ফিরে চাহিয়া দেখার নূন্যতম সময় বা সদিচ্ছা তাদের নাই।
সংকটে কদর বাড়ে, অর্জনে বাড়ে দূরত্বঃ
রাজনৈতিকি দলগুলোর এই দ্বিচারিতা সবচেয়ে স্পষ্ট হয় যখন ক্ষমতার মসনদ নড়েবড়ে হয়ে ওঠে কিংবা বিরোধীদের তীব্র পদচারণায় রাজপথ উত্তপ্ত হয়। ঠিক তখনই ড্রয়িংরুমে বসে থাকা ঠান্ডা মাথার নেতাদের কাছে মাঠের সাধারণ কর্মীর কদর রাতারাতি জ্যামিতিক হারে বেড়ে যায়। তখন পুনরায় ডাক পড়ে—বুকের তাজা রক্ত ঢেলে দিয়ে উত্তপ্ত রাজপথ ঠান্ডা করার জন্য, দলের ‘সম্মান’ বাঁচানোর জন্য। নেতাদের তৈরি করা স্বার্থের এই জটিল ছকে কর্মীরা যুগ যুগ ধরে কেবল ব্যবহারের ‘খড়কুটো’ ও ঢাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। নিজেরা ক্ষমতার সুউচ্চ প্রাসাদে সুরক্ষিত থেকে সাধারণ ঘরের সন্তানদের রাজপথের কামানের গোলা বানানোর এই সংস্কৃতি পৃথিবীর আর কোনো সভ্য গণতান্ত্রিক দেশে এত প্রকট নয়।
বিবেক জাগানোর আহ্বান: অন্ধ আনুগত্য বনাম আত্মোপলব্ধিঃ
ওহে রাজপথের লড়াকু সৈনিক, তোমার এই অন্ধ মোহ আর বিবেকবোধ জাগবে কবে? আর কত জনম পরে, কত হাজারো সহযোদ্ধার লাশ দেখার পর তুমি বুঝবে—তোমার এই অমূল্য জীবন, যৌবন ও ভবিষ্যৎকে পুঁজি করে ওরাই ‘জনতার অধিকার’ ও ‘গণতন্ত্রের’ নামে মূলত ক্ষমতার নোংরা ও লাভজনক ব্যবসা ফেঁদে বসেছে? ইতিহাসের নির্মম শিক্ষা হলো, অন্ধ আনুগত্য কখনোই কোনো কর্মীর বা দেশের কল্যাণ বয়ে আনে না। তাই জাগো বাহে! নিজের সুপ্ত বিবেককে জাগাও। দল বা নেতার অন্ধ স্তাবক হওয়ার আগে নিজের জীবন, নিজের বৃদ্ধ বাবা-মা এবং পরিবারকে ভালোবাসতে শেখো। রাজনীতির নামে সস্তা আবেগের বলি না হয়ে, অন্ধ মোহের দেয়াল ভেঙে নিজের নাগরিক অধিকার সম্পর্কে সচেতন হও। যেদিন কর্মীরা অন্ধ অনুসারী থেকে সচেতন নাগরিকে রূপান্তরিত হবে, সেদিনই এদেশের রাজনীতিতে প্রকৃত গুণগত পরিবর্তন আসবে।
(লেখক: উপাচার্য, দারু সালাম বিশ্ববিদ্যালয়, সোমালিয়া এবং রাজনীতি বিশ্লেষক)
প্রকাশক ও সম্পাদক, মোঃ জিল্লুর রহমান,০১৮৫৯-৬৬৭৬০২,০১৭০৭-৫০১৪১৪নি,র্বাহী সম্পাদক, মোঃ আঃ রাজ্জাক সরকার, বার্তা সম্পাদক, মোঃ রতন মন্ডল
প্রধান কার্যালয়ঃ মিরপুর ১২ ঢাকা ১২১৬,mail: jillumia87@gmail.com
Copyright © 2026 দুর্নীতির তালাশ টিম. All rights reserved.