
সৌদি পাঠানোর নামে প্রতারণা: বাউফলে মিজান চক্রের বিরুদ্ধে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ
পটুয়াখালী জেলা প্রতিনিধি।
পটুয়াখালী জেলার বাউফলে সৌদি আরবে আকর্ষনীয় বেতনের চাকরির প্রলোভন দেখিয়ে সাধারণ মানুষের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে মো. মিজান হাওলাদার নামের এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে। জালিয়াতি, ভুয়া ভিসা প্রদান ও প্রতারণার এই ফাঁদে পড়ে নিঃস্ব হয়েছেন অন্তত ১৫ থেকে ২০ জন প্রবাসী ও তাদের পরিবার। পাওনা টাকা ফেরত চাওয়ায় উল্টো ভুক্তভোগীদের প্রকাশ্যে খুন-জখমের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ এনে সম্প্রতি বাউফল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে।
থানায় অভিযোগ ও ঘটনার বিবরণ:
থানায় দায়েরকৃত লিখিত অভিযোগসূত্রে জানা যায়, বাউফল উপজেলার দাসপাড়া ইউনিয়নের ৩নং ওয়ার্ডের বাসিন্দা মো. ইউনুছ মাস্টারের ছেলে মো. মিজান হাওলাদার (৩৫) ও তার সহযোগী মেরিনা আক্তার (৩০)-এর বিরুদ্ধে অভিযোগ এনেছেন স্থানীয় বাসিন্দা মো. মনিরুল ইসলাম (২৪)।
অভিযোগপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রতারক চক্রটি ২০২৩ সালে সৌদি আরবে ভালো চাকরির প্রতিশ্রুতি দিয়ে ভুক্তভোগী মনিরুল ইসলামের কাছ থেকে ৪ লাখ ৫০ হাজার টাকা গ্রহণ করে। পরবর্তীতে তাকে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র ও বৈধ আকামা ছাড়া জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি ভুয়া ভিসা দিয়ে সৌদি আরবে পাঠানো হয়। সেখানে পৌঁছানোর পর মনিরুল জানতে পারেন, তাকে আকামাহীন অবস্থায় অন্যের কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবে চরম কষ্টে দুই মাস অবস্থান করার পর কোনো উপায় না পেয়ে নিজের খরচে তিনি দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হন।
টাকা ফেরত চাওয়ায় প্রকাশ্যে হুমকি:
ভুক্তভোগীর দাবি অনুযায়ী, দেশে ফিরে পাওনা টাকা ফেরত চাইলে আসামিরা বারবার তারিখ দিয়ে ঘুরাতে থাকে এবং বেশ কয়েকবার সালিশ-বৈঠক হওয়া সত্ত্বেও টাকা পরিশোধ করেনি। একপর্যায়ে চক্রটি এলাকা ছেড়ে ঢাকায় আত্মগোপন করে মোবাইল বন্ধ রাখে।
সর্বশেষ গত ৭ অক্টোবর ২০২৬ তারিখ দুপুর আনুমানিক ১২.০০ ঘটিকায় বাউফলের কালাইয়া ইউনিয়নের ২নং ওয়ার্ডে অভিযুক্তদের ভাড়া বাসার সামনে পাওনা টাকা ফেরত চাইতে গেলে বিবাদীরা বাকবিতণ্ডায় জড়ায়। টাকা ফেরত দেওয়া হবে না বলে সাফ জানিয়ে দেয় এবং বাদি মনিরুল ইসলামকে প্রকাশ্যে খুন-জখম করার হুমকি প্রদান করে। পরবর্তীতে স্থানীয় লোকজন এসে তাকে উদ্ধার করেন।
প্রতারণার অভিনব কৌশল ও মরুর দেশে মানবেতর জীবন:
অনুসন্ধানে জানা যায়, মো. মিজান হাওলাদার নিজে সৌদি আরবে একটি সাধারণ চাকরি করেন, যার মাসিক বেতন প্রায় ১,৩০০ রিয়াল (বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ৪১,৬০০ টাকা)। তবে দেশে এসে নিজেকে সৌদি আরবের একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে জাহির করতেন এবং মাসে ৩ থেকে ৪ লাখ টাকা আয়ের ভুয়া গল্প ফেঁদে বেকার যুবকদের আকৃষ্ট করতেন।
মিজানের প্রলোভনে পড়ে নিঃস্ব হওয়া অনেক প্রবাসী বর্তমানে সৌদি আরবে আকামা ও কাজহীন অবস্থায় অনাহারে-অর্ধাহারে দিন কাটাচ্ছেন। অনেকের পাসপোর্ট নিজের জিম্মায় আটকে রেখে মরুভূমিতে ফেলে আসার হুমকি দিয়ে অতিরিক্ত টাকা আদায়েরও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযুক্তের বক্তব্য:
তবে এসব অভিযোগের বিষয়টি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে অভিযুক্ত মো. মিজান হাওলাদার বলেন, “আমি কাউকেই বিদেশে পাঠাইনি এবং কারো কাছ থেকে বিদেশে পাঠানোর কথা বলে কোনো টাকা পয়সাও নিইনি। এলাকায় একটি পক্ষ সামাজিকভাবে আমাকে হেয় প্রতিপন্ন ও ব্ল্যাকমেইল করার জন্য আমার বিরুদ্ধে মিথ্যে অভিযোগ তুলে অপপ্রচার চালাচ্ছে।”
প্রশাসনের হস্তক্ষেপ কামনা:
এদিকে স্থানীয়দের দাবি, প্রবাসে সামান্য বেতনে চাকরি করলেও গত তিন বছরে দেশে মিজানের সম্পদের পরিমাণ হঠাৎ অস্বাভাবিকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ প্রবাসীদের রক্ত পানি করা কষ্টার্জিত অর্থ আত্মসাৎ করেই তিনি বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন বলে ভুক্তভোগীদের তীব্র অভিযোগ।
এ বিষয়ে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো প্রশাসনের আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। তারা প্রতারক চক্রের বিরুদ্ধে সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি এবং খোয়া যাওয়া অর্থ ও জিম্মায় থাকা পাসপোর্ট উদ্ধারের জোর দাবি জানিয়েছেন।
প্রতিবেদক:
(পটুয়াখালী) জেলা প্রতিনিধি
তারিখ ০৯/১০/২৬
Leave a Reply